টেকসিঁড়ি টিউটোরিয়ালঃ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দ্রুতগতি ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের মূল ভিত্তি হলো ফাইবার অপটিক কেবল (Fiber Optic Cable)। প্রথাগত তামার তারের (Copper Cable) মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল পাঠানোর বদলে এই প্রযুক্তিতে কাচ বা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের তৈরি সূক্ষ্ম তন্তুর মধ্য দিয়ে আলোর আলোকতরঙ্গ (Light Signals) হিসেবে ডেটা আদান-প্রদান করা হয়।
ফাইবার অপটিক কেবলের গঠন ও কার্যপ্রণালী
একটি ফাইবার অপটিক ক্যাবল মূলত মানুষের চুলের চেয়েও সরু কাচের তন্তু দ্বারা তৈরি। এর প্রধান অংশগুলো হলো:
কোর (Core):এটি কেবলের একদম ভেতরের অংশ, যার ভেতর দিয়ে আলো পরিভ্রমণ করে।
ক্ল্যাডিং (Cladding):কোরকে ঘিরে থাকা বাইরের কাচ বা প্লাস্টিকের স্তর। এর প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index) কোরের চেয়ে কম থাকে, ফলে আলো বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না।
কোটিং বা বাফার (Coating/Buffer): বাইরের আঘাত থেকে ভেতরের কাচের অংশকে রক্ষা করার প্লাস্টিক বা সিরামিক লেয়ার।
আউটার জ্যাকেট (Outer Jacket): এটি কেবলের সবচেয়ে বাইরের মজবুত সুরক্ষা স্তর। এটি পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection) নীতিতে কাজ করে। আলো যখন কোরের ভেতরে নির্দিষ্ট কোণে প্রবেশ করে, তখন তা ক্ল্যাডিংয়ের দেয়ালে বাধা পেয়ে বারবার প্রতিফলিত হয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকে।

ফাইবার অপটিক কেবলের প্রকারভেদ
১. মোড (Mode) অনুযায়ী প্রকারভেদ
আলো কেবলের কোরের ভেতর দিয়ে কীভাবে যাতায়াত করে, তার ওপর ভিত্তি করে এটি দুই প্রকার:
ক. সিঙ্গেল-মোড ফাইবার (Single-Mode Fiber – SMF): এর কোরের ব্যাস অত্যন্ত সরু বা ছোট (সাধারণত ৮ থেকে ১০ মাইক্রন)। সরু কোরের কারণে আলো শুধুমাত্র একটি সোজা পথ ধরে (Single Light Path) সোজা চলে যায়। এতে আলোর প্রতিফলন বা বিকিরণজনিত বিকৃতি (Modal Dispersion) হয় না। দীর্ঘ দূরত্ব (যেমন: টেলিকম নেটওয়ার্ক, সাবমেরিন কেবল, আইএসপি ব্যাকবোন) এবং উচ্চ ব্যান্ডউইথ পরি পরিবহনে লেজার আলোক উৎস ব্যবহার করে এটি চালানো হয়।
খ. মাল্টি-মোড ফাইবার (Multi-Mode Fiber – MMF):এর কোরের ব্যাস বেশ বড় (সাধারণত ৫০ থেকে ৬২.৫ মাইক্রন)। বড় কোর হওয়ায় আলো একসাথে বিভিন্ন কোণে বা একাধিক পথে (Multiple Light Paths) প্রতিফলিত হয়ে সামনের দিকে এগোয়। স্বল্প দূরত্বে (যেমন: ডাটা সেন্টার, লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক বা LAN, বা এক ভবনের সাথে অন্য ভবনের সংযোগে) এটি ব্যবহৃত হয়। এতে তুলনামূলক কম খরচের LED আলোক উৎস ব্যবহার করা যায়।
২. প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index Profile) অনুযায়ী প্রকারভেদ
মাল্টি-মোড ফাইবারে আলোর গতিপথ ও প্রতিসরাঙ্কের ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে একে আবার দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
ক. স্টেপ-ইনডেক্স ফাইবার (Step-Index Fiber)
কোর এবং ক্ল্যাডিংয়ের প্রতিসরাঙ্কের সংযোগস্থলে একটি স্পষ্ট পার্থক্য (Step) থাকে। আলো ভেতরে আঁকাবাঁকাভাবে জিকজ্যাক (Zig-zag) হয়ে প্রতিফলিত হয়, ফলে সিগন্যাল কিছুটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে (Dispersion বেশি)।
খ. গ্রেডেড-ইনডেক্স ফাইবার (Graded-Index Fiber)
কোরের কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে প্রতিসরাঙ্ক ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে আলো ঢেউয়ের মতো (Parabolic/Wave) বক্রপথে ভ্রমণ করে এবং কেবলের অপর প্রান্তে প্রায় একই সময়ে পৌঁছায়। এতে ডেটা লস ও ডিসপারশন কম হয়।
প্রথাগত মাধ্যমের তুলনায় ফাইবার অপটিকের সুবিধা
তামার তার (Twisted Pair / Coaxial) বা ওয়্যারলেস মাধ্যমের চেয়ে ফাইবার অপটিক অনেক বেশি কার্যকর। এর প্রধান সুবিধাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অত্যন্ত উচ্চ ব্যান্ডউইথ (Extreme Bandwidth):ফাইবার অপটিক কেবলের ডেটা বহন ক্ষমতা অপরিসীম। আলো ব্যবহার করে ডেটা পাঠানো হয় বলে এতে প্রতি সেকেন্ডে একাধিক টেরাবিট (Tbps) স্পিডে ডেটা ট্রান্সফার করা সম্ভব, যা তামার তারের তুলনায় হাজার গুণ বেশি।
২. দীর্ঘ দূরত্বে সংকেতের স্থায়িত্ব (Low Attenuation):তামার তারের মধ্যে বৈদ্যুতিক বাধা (Resistance) থাকায় কিছু দূর পরপর সিগন্যাল দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু ফাইবার অপটিকে আলোর অপচয় অত্যন্ত কম হওয়ায় এটি রিপিটার বা অ্যাম্প্লিফায়ার ছাড়াই ১০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বা তারও বেশি দূরত্বে সিগন্যাল পাঠাতে পারে।
৩. তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিঘ্ন থেকে সুরক্ষা (EMI Immunity):ফাইবার অপটিক কোনো বিদ্যুৎ পরিবহন করে না, তাই এতে পরিবেশের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফেরেন্স (EMI), রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা বজ্রপাতের মতো বাহ্যিক কারণে ডেটা সিগন্যাল বিকৃত (Distortion) হয় না।
৪. উচ্চ নিরাপত্তা (Enhanced Data Security):তামার তার থেকে বাইরে থেকে সিগন্যাল ক্যাচ করে (Eavesdropping/Tapping) তথ্য চুরি করা সম্ভব। কিন্তু কাচের তন্তুর ভেতর দিয়ে যাওয়া আলোর সিগন্যাল বাইরে থেকে ট্যাপ করা প্রায় অসম্ভব। ফাইবার ফাটল ধরলে বা কাটলে সাথে সাথে সিগন্যাল ড্রপ করে, ফলে অনুপ্রবেশ দ্রুত চিহ্নিত করা যায়।
৫. হালকা ওজন ও ছোট আকার:তামার কেবলের তুলনায় ফাইবার অপটিক কেবল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও হালকা। ফলে পাইপলাইন বা মাটির নিচে এটি নমনীয়ভাবে স্থাপন করা অনেক সহজ।
সম্পাদনায়, সামিউল হক সুমন, নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি – বাংলাদেশ



