টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : তারবিহীন বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন। ইউনিভার্সিটি অফ হেলসিংকি এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওউলু-র গবেষকরা যৌথভাবে দেখিয়েছেন যে, তার এর বদলে আল্ট্রাসনিক শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে খোলা বাতাসে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিদ্যুৎ বা বৈদ্যুতিক স্পার্ক পাঠানো সম্ভব।
স্পেন ও কানাডার বিজ্ঞানীদের সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো দেখা গেছে যে, লেজার ও আল্ট্রাসনিক ফিল্ড ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গকে নিরাপদ পথে পরিচালনা করা যায়। সাধারণত বৈদ্যুতিক স্পার্ক ওয়েল্ডিং, জীবাণু ধ্বংস বা গাড়ির ইঞ্জিনে জ্বালানি পোড়াতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু খোলা বাতাসে স্পার্ক নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এটি এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে বা কাছাকাছি কোনো ধাতব বস্তুর দিকে ধাবিত হয়।
গবেষকরা উচ্চ-তীব্রতার আল্ট্রাসনিক শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে বাতাসে একটি অদৃশ্য পথ তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাঠানো যায়। এমনকি এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ যেকোনো বাধা এড়িয়ে আঁকাবাঁকা পথেও চলতে সক্ষম।
গবেষণার প্রধান ড. আসিয়ার মারজো জানান, বৈদ্যুতিক স্পার্ক চলাচলের সময় বাতাসকে উত্তপ্ত করে তোলে। উত্তপ্ত বাতাস হালকা হয়ে প্রসারিত হয়। আল্ট্রাসনিক তরঙ্গ এই হালকা বাতাসকে নির্দিষ্ট পথে ধরে রাখে। যেহেতু বিদ্যুৎ সবসময় কম বাধার পথে চলতে পছন্দ করে, তাই পরবর্তী স্পার্কগুলো সেই হালকা বাতাসের পথ অনুসরণ করে একটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, চার সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের একটি বৈদ্যুতিক স্পার্ককে কোনো বাধা এড়িয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সফলভাবে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
এর আগে লেজার ব্যবহার করে বিদ্যুৎ পরিবহনের চেষ্টা করা হলেও তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মানবদেহের চোখ ও ত্বকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু নতুন এই আল্ট্রাসনিক পদ্ধতি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এর যন্ত্রপাতি তুলনামূলক সস্তা ও আকারে ছোট।
‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি মিলি-সেকেন্ডের মধ্যে উচ্চ-ভোল্টেজের বিদ্যুৎকে নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এই প্রযুক্তি কেবল বিদ্যুৎ পরিবহনেই নয়, বরং আরও অনেক ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক কেন্দ্র বা রাসায়নিক কারখানার মতো বিপজ্জনক স্থানে যেখানে তার ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে এই ‘পাওয়ার-বাই-লাইট’ পদ্ধতি কার্যকর হবে।
এছাড়া গবেষকরা এমন সিস্টেম তৈরি করছেন যা চারপাশের রেডিও সিগন্যাল থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে ছোট ডিভাইস বা সেন্সর চালাতে পারবে। এমনকি এর মাধ্যমে অন্ধদের জন্য ‘স্পর্শহীন ব্রেইল পদ্ধতি’ (Contactless Braille system) তৈরির স্বপ্নও দেখছেন বিজ্ঞানীরা।


