টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : মাত্র ২০ মিনিটেই মোবাইল বর্জ্য থেকে মিলবে সোনা ! শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্য এবং ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য থেকে সোনা সংগ্রহের এই বৈপ্লবিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন চীনা গবেষকরা। এই নতুন প্রযুক্তিটি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব।
উদ্ভাবিত এই নতুন প্রযুক্তিটি মূলত ‘সিলেক্টিভ লিচিং’ (Selective Leaching) পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং বা পুনর্প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে এবং খনি থেকে সোনা উত্তোলনের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনা একাডেমি অফ সায়েন্সেসের অধীনস্থ গুয়াংজু ইনস্টিটিউট অফ এনার্জি কনভারশন এবং সাউথ চায়না ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির বিজ্ঞানীদের একটি যৌথ দল এই পদ্ধতিটি তৈরি করেছেন। গবেষকদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় কক্ষ তাপমাত্রায় মাত্র ২০ মিনিটেরও কম সময়ে পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম থেকে সোনা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এটি বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যয়ে কাজ সম্পন্ন করতে পারে, যা এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।
গবেষণাগারে পরীক্ষার সময় দেখা গেছে, এই কৌশলের মাধ্যমে পুরনো মোবাইল ফোনের ফেলে দেওয়া সিপিইউ (CPU) এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড থেকে ৯৮.২ শতাংশেরও বেশি সোনা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় কোনো উচ্চ তাপ বা কঠোর রাসায়নিক পরিবেশের প্রয়োজন হয় না, ফলে এটি অত্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর।
প্রচলিত পদ্ধতিতে ই-বর্জ্য থেকে সোনা বের করতে হলে বিশাল চুল্লিতে উচ্চ তাপমাত্রায় বর্জ্য পোড়াতে হতো অথবা ‘অ্যাকুয়া রেজিয়া’র মতো অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিষাক্ত অ্যাসিড ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু চীনের এই পদ্ধতিতে গবেষকরা এমন একটি বিশেষ রাসায়নিক মিশ্রণ তৈরি করেছেন যা কেবল সোনার অণুগুলোকেই লক্ষ্য করে। এই প্রক্রিয়ার জন্য কোনো আগুনের বা তাপের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ ঘরের তাপমাত্রাতেই রাসায়নিক বিক্রিয়াটি ঘটে।মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে সার্কিট বোর্ডে থাকা সোনার প্রলেপ তরলে দ্রবীভূত হয়ে আলাদা হয়ে যায়, যা আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিত।
এই পদ্ধতিটিকে ‘সবুজ প্রযুক্তি’ (Green Technology) বলা হচ্ছে কারণ বর্জ্য পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না বলে বাতাস বিষাক্ত হয় না। সোনা আলাদা করার পর ব্যবহৃত তরল বা দ্রাবকটি পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব, ফলে রাসায়নিক বর্জ্য কম তৈরি হয়। উচ্চ শক্তি বা বিদ্যুতের প্রয়োজন না হওয়ায় এটি কার্বন নিঃসরণ অনেক কমিয়ে দেয়।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই নতুন পদ্ধতিটি সফলভাবে বাণিজ্যিকীকরণ করা গেলে একদিকে যেমন বর্জ্য দূষণ কমবে, অন্যদিকে ইলেকট্রনিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। বর্তমানে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয় যার মাত্র ২০% রিসাইকেল করা হয়।
চীনের এই পদ্ধতিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে বর্তমান পদ্ধতির তুলনায় খরচ ৭০% পর্যন্ত কমে যাবে। এক টন আকরিক সোনা খনি থেকে তুলতে যে পরিমাণ পরিশ্রম ও দূষণ হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি সোনা কয়েক শ পুরনো মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। বড় বড় শহরগুলো এখন সোনার খনিতে পরিণত হবে, কারণ সেখানে পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের স্তূপ সবচেয়ে বেশি।
সুত্র দ্যা এমইএস টাইমস
আরও পড়ুন
২০৫০ সাল নাগাদ ১০ লক্ষ টন ই-বর্জ্য তৈরি করবে হেলথ ওয়্যারেবল ডিভাইস



