টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : ভারত সরকার সম্প্রতি স্মার্টফোন এবং টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য অত্যন্ত কঠোর কিছু নিরাপত্তা বিধিমালা প্রস্তাব করেছে, যা অ্যাপল, স্যামসাং এবং গুগলের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মূলত ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা এবং সাইবার অপরাধ কমানোর কথা বলা হলেও, টেক জায়ান্টরা এটিকে তাদের ব্যবসায়িক গোপনীয়তা এবং ব্যবহারকারীর প্রাইভেসির জন্য হুমকি মনে করছে।
নিয়মগুলো কি কি আসুন জেনে নিই ।
সোর্স কোড (Source Code) শেয়ার করার বাধ্যবাধকতা –
সবচেয়ে বিতর্কিত প্রস্তাব হলো স্মার্টফোন নির্মাতাদের তাদের ফোনের অপারেটিং সিস্টেমের ‘সোর্স কোড’ সরকারের কাছে জমা দেওয়া। সোর্স কোড হলো যেকোনো সফটওয়্যারের মূল ভিত্তি বা ‘মাস্টার কি’। টেক কোম্পানিগুলোর দাবি, এটি শেয়ার করলে তাদের বাণিজ্যিক গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে এবং হ্যাকারদের হাতে পড়লে ফোনের নিরাপত্তা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
প্রি-ইনস্টল করা অ্যাপ (Bloatware) ডিলিট করার সুযোগ-
ভারতে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ ফোনে আগে থেকেই কিছু অ্যাপ (যেমন নিজস্ব ব্রাউজার, পেমেন্ট অ্যাপ বা অ্যাপ স্টোর) ইনস্টল করা থাকে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই ব্যবহারকারীকে এই অ্যাপগুলো আনইনস্টল করার অপশন দিতে হবে। এতে স্যামসাং বা শাওমির মতো কোম্পানিগুলো বড় ধরনের রাজস্ব হারাবে, কারণ তারা থার্ড-পার্টি অ্যাপ থেকে আয়ের জন্য এগুলো প্রি-ইনস্টল করে রাখে।
বাধ্যতামূলক সরকারি সাইবার সিকিউরিটি অ্যাপ-
সম্প্রতি ভারত সরকার ‘সঞ্চার সাথী’ (Sanchar Saathi) নামক একটি সরকারি সাইবার নিরাপত্তা অ্যাপ প্রতিটি ফোনে প্রি-ইনস্টল করার নির্দেশ দিয়েছিল, যা ডিলিট করা যাবে না। যদিও তীব্র সমালোচনার মুখে এই সিদ্ধান্তটি আপাতত বাধ্যতামূলক নয় বলে জানানো হয়েছে, তবে এটি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সমালোচকদের মতে, এটি নাগরিকদের ওপর সরকারি নজরদারির একটি টুল হতে পারে।
সফটওয়্যার আপডেট স্ক্রিনিং-
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোকে যেকোনো বড় ওএস (OS) আপডেট বা সিকিউরিটি প্যাচ রিলিজ করার আগে সরকারি ল্যাবে পরীক্ষা করাতে হবে। কোম্পানিগুলোর দাবি, এর ফলে নতুন ফোন লঞ্চ করতে বা জরুরি নিরাপত্তা আপডেট দিতে অনেক দেরি হয়ে যাবে, যা ব্যবহারকারীদের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
অলওয়েজ অন লোকেশন (A-GPS) ট্র্যাকিং-
সরকার একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে যেখানে ফোনের স্যাটেলাইট লোকেশন ট্র্যাকিং বা এ-জিপিএস সর্বদা সক্রিয় রাখতে হবে। বর্তমানে এটি কেবল নির্দিষ্ট অ্যাপ বা জরুরি কলের সময় চালু হয়। ব্যবহারকারী যাতে এটি বন্ধ করতে না পারেন, এমন নির্দেশনার কথা শোনা যাচ্ছে, যাকে ডিজিটাল অধিকার কর্মীরা ‘ভয়াবহ নজরদারি’ বলে অভিহিত করেছেন।
সরকার বলছে, এই কঠোর পদক্ষেপগুলো মূলত ভুয়া আইএমইআই (IMEI) নম্বর ব্যবহার করে জালিয়াতি ঠেকানো এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। বর্তমানে ভারত সরকার এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষি চলছে।
এই নিয়মগুলো নিয়ে কোম্পানিগুলো উদ্বিগ্ন কারণ সোর্স কোড বা গভীর নজরদারি ব্যবস্থার ফলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রতিটি ফোনের জন্য সরকারি ল্যাবের ছাড়পত্র নিতে ২১ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় লাগতে পারে, যা নতুন ফোন বাজারে আনার গতি কমিয়ে দেবে। প্রি-ইনস্টল করা অ্যাপ থেকে আসা কোটি কোটি টাকার আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
ভারত সরকার এবং টেক কোম্পানিগুলোর মধ্যে বর্তমানে ‘India Cellular and Electronics Association’ (ICEA)-এর মাধ্যমে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। কোম্পানিগুলো সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে যে, তারা সোর্স কোড না দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট কিছু নিরাপত্তা সার্টিফিকেট জমা দেবে। অন্যদিকে, সরকার এই নিয়মগুলোকে কিছুটা শিথিল করার কথা ভাবছে যাতে ব্যবসা করার পরিবেশ নষ্ট না হয়।


