টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিল এক কিশোর। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ। বাবার দেওয়া একটি সাধারণ ল্যাপটপই ছিল তার সম্বল। সেই ল্যাপটপে ইউটিউব দেখে কোডিংয়ের হাতেখড়ি হওয়া সেই কিশোরই আজ যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। নাম তার ইশরাক খান। মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের এআই স্টার্টআপ ‘কোডেজি’ (kodezi), যা ইতোমধ্যে ২০ লাখ ডলারের (প্রায় ২২ কোটি টাকা) বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে।
আইডিয়ার শুরু ক্লাসরুম থেকে
ইশরাকের উদ্যোক্তা হওয়ার বীজ বপন হয়েছিল নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। কম্পিউটার সায়েন্স ক্লাসে তিনি লক্ষ্য করেন, শিক্ষার্থীরা কোডের ভুল বা ‘ডিবাগিং’ ঠিক করতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করছে। ইশরাকের মাথায় প্রশ্ন আসে—লেখার ভুল ধরার জন্য যদি ‘গ্রামারলি’ থাকতে পারে, তবে কোডিংয়ের ভুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক করার কোনো টুল কেন থাকবে না?
এই চিন্তা থেকেই শুরু হয় গবেষণা। টানা এক বছর মেশিন লার্নিং শেখা আর অসংখ্য বার ব্যর্থ হওয়ার পর তৈরি হয় একটি প্রোটোটাইপ। হাইস্কুলের সিনিয়র ইয়ারে পড়ার সময় প্রথমবার একজন বিনিয়োগকারীর (ভিসি) নজরে আসেন তিনি। যদিও তখন কোনো ব্যবসায়িক মডেল ছিল না, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই ইশরাককে বড় পরিসরে ভাবতে শেখায়।
সাহস ও ই-মেইলের শক্তি
১৭ বছর বয়সে কোম্পানি শুরুর পথে ইশরাকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল ই-মেইল। অপরিচিত সিইও, বিনিয়োগকারী আর গবেষকদের নিয়মিত ই-মেইল করতেন তিনি। পরামর্শ চাইতেন, শেয়ার করতেন নিজের আইডিয়া।
একবার ‘ওরল্যান্ডো সিন্যাপ্স’ নামের এক প্রযুক্তি ইভেন্টে অংশ নিতে চাইলেন ইশরাক। কিন্তু ৫০০ ডলারের বুথ ফি দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। দমে না গিয়ে তিনি আয়োজকদের সরাসরি ই-মেইল করে নিজের সীমাবদ্ধতা জানান। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মেলে অভাবনীয় সাড়া পান, বিনা মূল্যে বুথ পায় তার স্টার্টআপ। সেই ইভেন্টের অভিজ্ঞতা লিংকডইনে শেয়ার করার পরেই ইশরাক পান তার প্রথম ‘অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর’।
বিনিয়োগ ও চ্যালেঞ্জ
১৮ বছর হওয়ার আগেই ২০ হাজার ডলার বিনিয়োগ পান ইশরাক। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। তখনো চ্যাটজিপিটি আসেনি, কিশোর ইশরাকের এআই প্রযুক্তিতে অনেকেই ভরসা করতে পারছিলেন না। তবে জেনারেটিভ এআই-এর বিপ্লব শুরু হলে দৃশ্যপট বদলে যায়। ১৯ বছর বয়সেই তার বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৮ লাখ ডলারে। আর ২২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সেই অঙ্ক ছাড়িয়ে যায় ২০ লাখ ডলার।
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ইশরাক ৩টি মূল প্রশ্নের উত্তর দিতে শিখেছিলেন: তুমি কী তৈরি করছ? এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? এবং এটি কেন একটি বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হবে?
আইভি লিগ ছেড়ে উদ্যোক্তা জীবনে
উচ্চশিক্ষার জন্য ইশরাক আবেদন করেছিলেন ৬০টি কলেজে। ডজনখানেক কলেজে ভর্তির সুযোগও পান, যার মধ্যে ছিল বিশ্বখ্যাত আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু জীবনের বড় মোড়ে দাঁড়িয়ে ইশরাক সিদ্ধান্ত নেন কলেজে না যাওয়ার। তার ভাষায়: “আমি যদি কলেজে যেতাম, তবে নিজের কাছেই হতাশ হতাম। এখন যদি এআই কোম্পানি না গড়ি, তবে কয়েক হাজার মানুষ আমার চেয়ে এগিয়ে যাবে। কলেজ পরে করা যাবে, কিন্তু এই সুযোগ আর আসবে না।”
ভবিষ্যতের ‘স্বয়ংক্রিয় মেকানিক’
বর্তমানে ইশরাকের প্রতিষ্ঠান ‘কোডেজি’-তে কাজ করছেন ৩৫ জনেরও বেশি কর্মী। গত ছয় বছর ধরে তিল তিল করে কোম্পানিটিকে বড় করেছেন তিনি। বড় বড় এন্টারপ্রাইজ কোম্পানিগুলোর জন্য কোড রক্ষণাবেক্ষণের ‘ডিফল্ট সিস্টেম’ হওয়াই এখন তার মূল লক্ষ্য।
ইশরাকের সহজ ব্যাখ্যা—”কোড লেখা যদি গাড়ি বানানোর মতো হয়, তবে সেটি সচল রাখতে একজন মেকানিক লাগে। আমরা সফটওয়্যারের সেই স্বয়ংক্রিয় মেকানিক হতে চাই।” বাংলার এই তরুণ এখন বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করছেন, সঠিক লক্ষ্য আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকেই বিশ্ব জয় করা সম্ভব।
ইশরাকের এবাউট থেকে পাওয়া – ‘আমি বাংলাদেশের ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেছি এবং ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছি। সেই পরিবর্তন আমার চিন্তাভাবনাকে রূপ দিয়েছে: দ্রুত মানিয়ে নেওয়া, স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং প্রাথমিক নীতি থেকে তৈরি করা। আমি ইংরেজি শিখি এবং অল্প বয়সে কোডিং শুরু করি। আমি ছোটবেলায় পণ্য তৈরি শুরু করি এবং ঐতিহ্যবাহী কলেজ পথ অনুসরণ না করে কাজ করে শেখার উপর মনোযোগ দিই। আজ আমি কোডেজি তৈরি করছি, কোডবেসের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত অপারেটিং সিস্টেম যা একটি AI CTO হিসেবে কাজ করে। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয় না। এটি তার জীবনচক্র জুড়ে সফ্টওয়্যার মনে রাখে, নিরাময় করে, বিকশিত হয় এবং পরিচালনা করে। নির্মাণের বাইরে, আমি সিস্টেম ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত সিস্টেম তৈরির মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে লিখি। আপনি যদি এমন সিস্টেম তৈরি করেন যা প্রযুক্তি, সঙ্গীত বা সৃজনশীল কাজে স্থায়ী হয়, তাহলে আমি সংযোগ স্থাপন করতে চাই।”



