সামিউল হক সুমনঃ প্রযুক্তির আধুনিকায়নে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এখন এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্যামেরার সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের শনাক্ত করছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি যেমন ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে সাহায্য করছে, তেমনি একে পুঁজি করে রাজধানীতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একদল ডিজিটাল প্রতারক চক্র। সম্প্রতি চালক ও গাড়ি মালিকদের ফোনে “এআই ক্যামেরায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা” সংক্রান্ত ভুয়া মেসেজ (SMS) বা লিংক পাঠিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ আপনার ফোনে এমন কোনো মামলার নোটিশ বা মেসেজ আসলে কীভাবে বুঝবেন সেটি আসল নাকি নকল? আর এই ফাঁদে পড়লে আপনার করণীয়ই বা কী?
ভুয়া এআই ট্রাফিক মামলার ফাঁদ আসলে কী?
অপরাধীরা মূলত মানুষের আইনি ভীতি এবং প্রযুক্তির অজ্ঞতাকে কাজে লাগায়। তাদের প্রতারণার ধরনটি সাধারণত এমন হয়:
- হুবহু নকল এসএমএস (SMS): আপনার মোবাইলে একটি মেসেজ আসবে, যা দেখতে হুবহু ট্রাফিক পুলিশের অফিসিয়াল মেসেজের মতো। সেখানে বলা থাকবে, “এআই ক্যামেরায় আপনার গাড়িটির গতিসীমা লঙ্ঘন বা উল্টো পথে চলার অপরাধ শনাক্ত হয়েছে। এত টাকা জরিমানা করুন।”
- প্রতারণামূলক লিংক (Phishing Link): মেসেজের সাথে একটি লিংক দেওয়া থাকে। বলা হয়, এই লিংকে ক্লিক করে বিকাশ, রকেট বা নগদের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ না করলে লাইসেন্স বাতিল বা গাড়ি জব্দ করা হবে।
- ভুয়া ওয়েবসাইট: লিংকে ক্লিক করলে যে ওয়েবসাইটটি আসে, সেটি দেখতে হুবহু সরকারি বা ট্রাফিক পুলিশের ওয়েবসাইটের মতো তৈরি করা থাকে।
আসল বনাম ভুয়া ট্রাফিক মামলা চেনার উপায়
একটু সতর্ক হলেই আপনি আসল এবং ভুয়া মেসেজের পার্থক্য বুঝতে পারবেন:

এমন মেসেজ বা নোটিশ পেলে আপনার করণীয়
যদি আপনি রাজধানীতে এমন কোনো সন্দেহজনক এআই ট্রাফিক মামলার মেসেজ পান, তবে তৎক্ষণাৎ নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
১। লিংকে ক্লিক করবেন না এবং টাকা দেবেন না: মেসেজে থাকা কোনো লিংকে ক্লিক করবেন না। এগুলো ‘ফিশিং লিংক’ হতে পারে, যার মাধ্যমে আপনার ফোনের ব্যক্তিগত তথ্য বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ অপরাধীদের হাতে চলে যেতে পারে। নিশ্চিত না হয়ে কোনো টাকা পরিশোধ করবেন না।
২। সরকারি ই-চালান যাচাই করুন: আপনার নামে আসলেই কোনো ট্রাফিক মামলা হয়েছে কিনা তা যাচাই করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো ডিএমপি-র অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে আপনার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও চেসিস নম্বর দিয়ে চেক করা। সেখানে কোনো রেকর্ড না থাকলে বুঝবেন মেসেজটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
৩। প্রমাণ সংরক্ষণ করুন: ভুয়া মেসেজটির স্ক্রিনশট নিন এবং যে নম্বর বা আইডি থেকে মেসেজটি এসেছে তা সংরক্ষণ করুন। পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এটি প্রয়োজন হবে।
৪। ট্রাফিক পুলিশ বা ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করুন: সন্দেহ হলে আপনার নিকটস্থ ট্রাফিক বক্স, ট্রাফিক পুলিশের কন্ট্রোল রুম অথবা ডিএমপি-র হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হোন।
৫। সাইবার ক্রাইম বিভাগে অভিযোগ করুন: আপনি যদি এই ধরনের জালিয়াতির শিকার হন বা মেসেজ পান, তবে বিষয়টি দ্রুত পুলিশকে জানান, নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করুন।
বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে অভিযোগ জানান।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে তাৎক্ষণিক সহায়তা চাইতে পারেন।
শেষ কথা
প্রযুক্তির যুগে অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে ঢাল বানিয়ে অপরাধীরা যেন আপনার পকেট কাটতে না পারে, সেজন্য সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কোনো ই-চালান বা ট্রাফিক মামলার মেসেজ আসলেই আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে তা যাচাই করুন, নিজে সুরক্ষিত থাকুন এবং অন্যকেও সচেতন করুন।
লেখকঃ নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী সম্পাদক, টেকসিঁড়ি ডট কম।


