সোহেল মৃধাঃ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) এর যাত্রা শুরু হলেও, দেড় দশকে এসে এই খাতটি একচেটিয়া নীতি ও উচ্চ ট্রানজেকশন চার্জের এক শোষনমূলক কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার অলস পুঁজি (Float Money) ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও MFS কোম্পানিগুলোর জন্য শত কোটি টাকার মুনাফা তৈরি করছে, অথচ যার টাকা সেই সাধারণ গ্রাহক ফিরছে শূন্য হাতে। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রবাসী পরিবার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের (SME) মূলধনকে এই বাড়তি খরচের অদৃশ্য ফাঁদ থেকে সুরক্ষা দিতে এবং একটি প্রকৃত ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বিনির্মাণে বর্তমান নীতিমালার আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
১. বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) এর যাত্রা শুরু হয় আজ থেকে দেড় দশক আগে।
প্রতিষ্ঠা কাল: ২০১১ সালের মে মাসে ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড (DBBL) বাংলাদেশে প্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে, যা পরবর্তীতে ‘রকেট’ (Rocket) নামে পুনর্নামকরণ করা হয়।
বিকাশের আগমন: এর ঠিক পরপরই, ২০১১ সালের জুলাই মাসে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘বিকাশ’ (bKash) তাদের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে।
মূল উদ্দেশ্য: সে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য ছিল “Financial Inclusion” বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ। অর্থাৎ দেশের ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর মধ্যে আনা। এই উদ্দেশ্য সফল হলেও সময়ের সাথে সাথে এই সেবাগুলোর একচেটিয়া নীতি ও উচ্চ চার্জ গ্রাহক শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
২. বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয়MFSকোম্পানিগুলোর পরিসংখ্যান ও সামগ্রিক বাজার চিত্র।
বাংলাদেশের MFS সেক্টরটি এখন আর একক কোনো কোম্পানির নয়, তবে এখানে তীব্র বাজার অসমতা বিদ্যমান। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত MFS গ্রাহক সংখ্যা ২২ কোটি ছাড়িয়েছে, কারণ একজন গ্রাহকের একাধিক অপারেটরে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। নিচে প্রধান প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
ক. নগদ (Nagad): গ্রাহক সংখ্যা: প্রায় ৮ কোটি ৫০ লক্ষের বেশি। কাগজে-কলমে নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যায় এটি বিকাশের চেয়ে বেশি দেখালেও সক্রিয় বা অ্যাক্টিভ ট্রানজেকশনের দিক থেকে এর অবস্থান দ্বিতীয়।
দৈনিক লেনদেন: দৈনিক প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ কোটি টাকা।
বৈশিষ্ট্য: ডাক বিভাগের ডিজিটাল লেনদেন সেবা হিসেবে এটি কাজ করে। এর ক্যাশ আউট চার্জ বিকাশের চেয়ে কিছুটা কম, যা অ্যাপে ১১.৪৯ টাকা এবং ইউএসএসডিতে ১৪.৯৪ টাকা।
খ. রকেট (Rocket – DBBL): গ্রাহক সংখ্যা: প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ।
দৈনিক লেনদেন: দৈনিক প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা।
বৈশিষ্ট্য: এটি সরাসরি ব্যাংকের সাথে যুক্ত অ্যাপ ও কার্ড সুবিধা দেয় এবং এটিএম থেকে নামমাত্র খরচে (০.৯%) ক্যাশ আউটের সুযোগ দেয়।
গ. উপায় (Upay) ও অন্যান্য (যেমন সেলফিন, ট্যাপ)
গ্রাহক সংখ্যা ও লেনদেন: উপায় সহ অন্যান্য ছোট MFS গুলোর সম্মিলিত বাজার অংশীদারিত্ব ৫% এর কম। এদের দৈনিক লেনদেন ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
৩. বিকাশের একক পরিসংখ্যান,স্থিতি (Float Money)ও ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের পুঁজিতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং বা MFS-এর বাজার অংশীদারিত্বের সিংহভাগই বিকাশের নিয়ন্ত্রণে, যা প্রায় ৭০% এর কাছাকাছি। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা অনুযায়ী এই পরিসংখ্যানটি নিম্নরূপ:
সর্বোচ্চ গ্রাহক সংখ্যা: বর্তমানে বিকাশের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৩০ লক্ষের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে একটি বড় অংশ সক্রিয় গ্রাহক।
দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ: সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে MFS সেক্টরে দৈনিক প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এর মধ্যে এককভাবে বিকাশের মাধ্যমেই দৈনিক প্রায় ২,৫০০ থেকে ২,৮০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়ে থাকে।
গ্রাহকদের মোবাইলে গড়ে জমানো টাকার পরিমাণ (Float Money): বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে যে টাকা অবিক্রীত বা অলস জমা থাকে, তাকে “ফ্লোট মানি” বলা হয়। গড়ে প্রতি গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে যদি ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকাও জমা থাকে, তবে সামগ্রিক হিসাবটি দাঁড়ায় বিশাল।
দৈনিক/মাসিক গড় স্থিতি (Total Float Value): প্রতিদিন গ্রাহকদের অলস জমানো টাকার মোট স্থিতি এককভাবে শুধু বিকাশের অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেই গড়ে ৬,০০০ কোটি থেকে ৮,০০০ কোটি টাকা, যা উৎসবের আগে আরও বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ পুরো এমএফএসসি বা সমগ্র সামগ্রিক ইন্ডাস্ট্রির মোট জমানো টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০,০০০ কোটি থেকে ১২,০০০ কোটি টাকা।
ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের পুঁজিতে ব্যাংক ও কোম্পানির মুনাফা:
এই বিশাল পরিমাণ টাকা দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে স্থায়ী আমানত (FDR) বা বিশেষ অ্যাকাউন্টে (SND) “ট্রাস্ট ফান্ড বা ট্রাস্ট কিউমুলেটিভ অ্যাকাউন্ট’ (TCA) হিসেবে জমা রাখতে হয়। এই ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টগুলো থেকে ব্যাংকগুলো বার্ষিক প্রায় ৬% থেকে ৮% পর্যন্ত সুদ বা মুনাফা দেয়। অর্থাৎ, শুধু বিকাশের ৮,০০০ কোটি টাকার ওপর বছরে প্রায় ৪৮ো কোটি থেকে ৬৪০ কোটি টাকা মুনাফা আসে এবং সমগ্র সামগ্রিক ইন্ডাস্ট্রির ১০,০০০ কোটি থেকে ১২,০০০ কোটি টাকার ওপর বাৎসরিক মুনাফা আসে প্রায় ৬০০ কোটি থেকে ৯৬০ কোটি টাকা। এই বিশাল পুঁজি বাজারে খাটছে, ব্যাংকগুলো মুনাফা করছে, MFS কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ পাচ্ছে, কিন্তু যার টাকা—সেই সাধারণ গ্রাহক শূন্য হাতে ফিরছে।
৪. জমানো টাকার ওপর গ্রাহকরা কেন লভ্যাংশ পায় না? (নীতিমালার পার্থক্য ও লুপহোল)
তফসিলি ব্যাংকে টাকা রাখলে সুদ বা মুনাফা পাওয়া গেলেও বিকাশে বা অন্যান্য এমএফএস-এ পাওয়া যায় না। এর মূল কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের “MFS Regulations” এবং ব্যাংকিং আইনের কাঠামোগত পার্থক্য ও লুপহোল:
MFS কোম্পানিগুলো কোনো ব্যাংক নয়:
বিকাশ, নগদ, রকেট বা উপায় কোনো পূর্ণাঙ্গ তফসিলি ব্যাংক নয়, এরা হলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার (MFSP)। ব্যাংকিং কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর লাইসেন্স, পরিচালনা, পরিচালক নিয়োগ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূলধন সংরক্ষণ, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণসহ অধিকাংশ কার্যক্রম এই আইনের আওতায় পরিচালিত হয়) অনুযায়ী কেবল তফসিলি ব্যাংকগুলোই সরাসরি জনগণের কাছ থেকে আমানত (Deposit) গ্রহণ করে তার বিপরীতে ঋণ দিতে পারে এবং সুদ বা মুনাফা নির্ধারণ করতে পারে।
আইনি নিষেধাজ্ঞা ও কৌশলী রেভিনিউ: এমএফএস নীতিমালা অনুযায়ী, গ্রাহকদের জমানো টাকা কোম্পানিগুলো নিজের ক্যাশবাক্সে রাখতে পারে না এবং কোনো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ইনভেস্ট বা সরাসরি কোনো ব্যবসা বা ঋণে খাটাতে পারে না। তবে ব্যাংকগুলো যখন এই ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের টাকার ওপর নির্দিষ্ট হারে সুদ বা মুনাফা কোম্পানিগুলোকে দেয়, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনের অস্পষ্টতার কারণে তার প্রায় ৪৫% থেকে ৫০% এমএফএস কোম্পানিগুলো তাদের সিস্টেম পরিচালনা, এজেন্ট কমিশন এবং অন্যান্য operational খরচ হিসেবে নিজেদের রেভিনিউ বা ব্যালেন্স শিটের প্রফিট হিসেবে দেখায়। বাকি অংশ গ্রাহকদের বিভিন্ন রিওয়ার্ড বা অফার হিসেবে ফেরত দেওয়ার কথা বলা থাকলেও তা সব সাধারণ গ্রাহক সমানভাবে বা সরাসরি legal প্রফিট হিসেবে অ্যাকাউন্টে পাবেন না।
৫. ব্র্যান্ড ডিসকাউন্ট বনাম বিকাশের নিজস্ব সুবিধা ও কৌশল
এখানে একটি অত্যন্ত চতুর ব্যবসায়িক ও বিপণন কৌশল কাজ করে। অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড শপে বিকাশে পেমেন্ট করলে ১০% বা ২০% ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। সাধারণ গ্রাহক মনে করেন এটি বিকাশের নিজস্ব সুবিধা, কিন্তু বাস্তবে এটি মূলত কো-ব্র্যান্ডিং মার্কেটিং।
আসল সত্য: এই ডিসকাউন্টের সিংহভাগ খরচ ওই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড নিজেই বহন করে তাদের নিজস্ব বিক্রি বাড়ানোর স্বার্থে। বিকাশ এখানে কেবল একটি “পেমেন্ট গেটওয়ে” এবং “বিজ্ঞাপন মাধ্যম” হিসেবে কাজ করে। ফলে, বিকাশ সরাসরি নিজের পকেট থেকে গ্রাহককে এই লাভ দিচ্ছে না—এটি একটি যৌথ ব্যবসায়িক কৌশল মাত্র, যা সাধারণ গ্রাহকের সবসময়ের বা সব খাতের লেনদেনে কোনো প্রকৃত আর্থিক মূল্য যোগ করে না।
(চলবে)
লেখক – উদ্যোক্তা, বিশ্লেষক, সিইও, কিনলে ডট কম।



