টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : শুক্রবার (১২ জুন, ২০২৬) নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জে এক ঐতিহাসিক অভিষেকের মধ্য দিয়ে পাবলিক মার্কেটে প্রবেশ করেছে ইলন মাস্কের রকেট ও স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স (SpaceX)। ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসের বৃহত্তম এই আইপিও (IPO) প্রক্রিয়ায় কোম্পানিটি বাজার থেকে রেকর্ড ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। এর ফলে স্পেসএক্সের বাজার মূল্য (Market Capitalization) ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা কোম্পানিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ মূল্যবান পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত করেছে।
একই সাথে এই মাইলফলকের মাধ্যমে ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার (Trillionaire) বা লক্ষ-কোটিপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
“মাত্র ১০% সফলতার সম্ভাবনা ছিল”
টেক্সাসে স্পেসএক্সের নিজস্ব কার্যালয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ঠিক আগে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সময় কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ইলন মাস্ক। ২০০২ সালে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠার শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে মাস্ক বলেন: শুরুর দিকে আমি ভেবেছিলাম এই কোম্পানির সফল হওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও কম। কেউ যদি তখন আমাকে বলত যে আজকের দিনে এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তবে আমি বলতাম— ভাই, আপনি নিশ্চয়ই খুব ভালো মানের কোনো ড্রাগস বা ক্র্যাক সেবন করছেন! কারণ আমি নিজেই নিশ্চিত ছিলাম যে এই কোম্পানিটি ব্যর্থ হতে যাচ্ছে।”
২৪ বছরের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মাত্র ২২,০০০ ফুল-টাইম কর্মী নিয়ে কাজ করা স্পেসএক্স আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
আইপিও-তে রেকর্ডের বন্যা
স্পেসএক্সের এই আইপিও ওয়াল স্ট্রিটের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
- রেকর্ড অর্থ সংগ্রহ: পাবলিক মার্কেটে শেয়ার বিক্রি করে স্পেসএক্স ৭৫ বিলিয়ন ডলার তুলেছে, যা ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর (Saudi Aramco) গড়া ২৯.৪ বিলিয়ন ডলারের পূর্ববর্তী রেকর্ডকে দ্বিগুণেরও বেশি ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে।
- শেয়ারের দাম ও বৃদ্ধি: আইপিও-তে প্রতিটি শেয়ারের প্রারম্ভিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩৫ ডলার। শুক্রবার লেনদেন শুরুর পর ‘SPCX’ টিকারে শেয়ারের দাম প্রায় ১৯.২% বৃদ্ধি পেয়ে ১৬০.৯৫ ডলারে গিয়ে থিতু হয়। লেনদেনের এক পর্যায়ে এর দর প্রায় ৩০% পর্যন্ত লাফিয়ে উঠেছিল।
- বিনিয়োগকারীদের হুড়োহুড়ি: বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারীদের (Retail Investors) মধ্যেও এই শেয়ার কেনার জন্য ব্যাপক উন্মাদনা দেখা গেছে। ব্ল্যাকরক (BlackRock) একাই ৫ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার ক্রয়ের আবেদন করেছিল।
মাস্কের একরোখা শর্ত এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিস্ময়
আইপিও-র নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত ব্যাংক ও শেয়ার বাজারের বিশেষজ্ঞদের সাথে দরদাম করে শেয়ারের দামের একটি সম্ভাব্য রেঞ্জ (Price Range) নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু স্পেসএক্সের ক্ষেত্রে কোনো দরদাম করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ইলন মাস্ক সরাসরি প্রতিটি শেয়ারের ফিক্সড দাম ১৩৫ ডলার নির্ধারণ করে বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন— “পছন্দ হলে নিন, না হলে যান” (Take it or leave it)।
গত বছর স্পেসএক্স ৪.৯ বিলিয়ন ডলারের নিট লোকসান গুনেছে। অথচ কোম্পানিটির বাজার মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে গত বছরের আয়ের প্রায় ১১২ গুণ! এই বিষয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের বিশিষ্ট বিনিয়োগ ব্যাংকার লয়েড গ্রিফ বলেন, “এই আইপিওটি বাজারের সাধারণ নিয়মে নির্ধারিত হয়নি। এটি পুরোপুরি ইলন মাস্কের নিজস্ব ইচ্ছা এবং স্পেসএক্সের ভবিষ্যৎ ভিশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।”
স্পেসএক্সের আয়ের উৎস ও ভবিষ্যৎ
যদিও রকেট উৎক্ষেপণ খাতের সিংহভাগ ভর স্পেসএক্স বহন করছে, তবে এই সেগমেন্টটি এখনও লাভজনক নয়। স্পেসএক্সের বর্তমান মূল আয়ের ইঞ্জিন হলো তাদের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক (Starlink), যা বর্তমানে বেশ লাভজনক।
এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক কোম্পানি ‘xAI’ (যার অধীনে গ্রোক চ্যাটবট ও কোলোসাস ডাটা সেন্টার রয়েছে) স্পেসএক্সের সাথে একীভূত হওয়ায় এর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১০টি ট্রিলিয়ন ডলারের (১ লাখ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের) কোম্পানির মধ্যে এখন দুটিই ইলন মাস্কের নিয়ন্ত্রণাধীন— একটি টেসলা (Tesla) এবং অন্যটি স্পেসএক্স। বাজারে এত দ্রুত ২ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করা স্পেসএক্সের এই যাত্রাকে বাজার বিশ্লেষকরা প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম সেরা “অনন্য সাধারণ রূপকথা” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।


