টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ড্রোন প্রযুক্তিতে নিজেদের এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে ইউক্রেন। ড্রোনের সফল ও আগ্রাসী ব্যবহার ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সামরিকভাবে শক্তিশালী রাশিয়ার বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিশাল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার এশিয়ার বাজারে পা রাখছে ইউক্রেনের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিশেষ করে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে চলমান ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে এশিয়ায় ড্রোনের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা লুফে নিতে চাইছে ইউক্রেন।
সম্প্রতি ইউক্রেনের অন্যতম শীর্ষ ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইউফোর্স’ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাপানের রাজধানী টোকিও সফর করেন। সেখানে তিনি জাপানি বিনিয়োগকারী ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের সামনে তাদের তৈরি ড্রোনের কার্যকারিতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলে ধরেন।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এখন বাণিজ্যের অস্ত্র
রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে , ইউক্রেনীয় ড্রোন কোম্পানিগুলো কেবল ড্রোন বিক্রি করতে নয়, বরং এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে ড্রোন উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং সফটওয়্যার উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে।
৪ বছর ধরে রুশ কামিকাজে ড্রোন, জ্যামিং বা ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও কার্যকারী হিসেবে গড়ে উঠেছে, যা এশিয়ার যেকোনো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
চীনকে বাদ দিয়ে তাইওয়ানমুখী ইউক্রেন
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেন ড্রোনের যন্ত্রাংশের জন্য মূলত চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে চীন পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর থেকে ইউক্রেন তাদের সরবরাহ চেইন থেকে চীনকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে ইউক্রেন, ইউরোপ, আমেরিকা ও তাইওয়ানের দিকে ঝুঁকছে। মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, নেভিগেশন সিস্টেম এবং উন্নত ব্যাটারি তৈরিতে তাইওয়ানের বৈশ্বিক সুনাম রয়েছে।
ইতিমধ্যেই তাইওয়ান থেকে ইউক্রেনে ড্রোন যন্ত্রাংশের রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই ড্রোন শিল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংহতকরণের জন্য ১.২৫ ট্রিলিয়ন তাইওয়ানিজ ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট ঘোষণা করেছেন।
এশিয়ায় চাহিদার কারণ
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে তাইওয়ান, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সস্তা ও কার্যকর ড্রোনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন নির্মাতারা মনে করছেন, চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলায় তাইওয়ানের জন্য এই ড্রোনগুলো ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে।
বর্তমানে ইউক্রেনীয় কিছু কোম্পানি লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে কারখানা স্থাপন করে তাইওয়ানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এছাড়াও এআই-চালিত ড্রোন চিপ তৈরির জন্য তাইওয়ানের অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি হাই-টেক কোম্পানিকে বড় অঙ্কের অনুদান দিচ্ছে।
মুলত , আধুনিক যুদ্ধের রূপ বদলে দেওয়া ইউক্রেনের সস্তা ও এআই-প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোন এখন এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে। চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ড্রোন প্রযুক্তির ওপর এশিয়ার দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এক নতুন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত দুয়ার খুলে দিয়েছে।
রয়টার্স


