সোহেল মৃধা : বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে এখন চারপাশে এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়েছে। এখানে শুধু গ্রাহকরাই ঠকছেন না, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিনিয়ত নানামুখী জালিয়াতির শিকার হচ্ছে। এই দ্বিমুখী প্রতারণা পুরো ইন্ডাস্ট্রির ওপর মানুষের বিশ্বাসটাই কমিয়ে দিয়েছে। অথচ অনলাইন কেনাকাটার বাজারকে বড় করতে হলে এই আস্থার সংকট দূর করার কোনো বিকল্প নেই।
গ্রাহকরা যখন নিশ্চিত হবেন যে তারা সঠিক পণ্য পাবেন, তখনই বিক্রির পরিধি বাড়বে। একইভাবে, প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ক্রেতাদের সততার বিষয়ে আশ্বস্ত হতে পারবে, তখনই তারা উন্নত সেবা ও নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। দিনশেষে এই পারস্পরিক আস্থার সুফল কিন্তু সাধারণ ভোক্তারাই পাবেন।
এই জট খুলতে হলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের সচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার ভেতরের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা। সমসাময়িক সময়ে দুই পক্ষ যেভাবে প্রতারিত হচ্ছে এবং তা থেকে উত্তরণের যে পথ, তা গভীর নিবিড়ভাবে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গ্রাহকরা যে দুই ভাবে ফাঁদে পড়ছেন — সনাতনী চাল এবং প্রযুক্তির নতুন রূপ
ডিজিটাল প্রযুক্তির যত প্রসার হচ্ছে, অসাধু চক্রগুলো গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলার জন্য সাধারণ জালিয়াতির পাশাপাশি তত নিত্যনতুন মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করছে। অনেকেই বাজারে ৫০% থেকে ১০০% পর্যন্ত ক্যাশব্যাক বা অবিশ্বাস্য কম দামে পণ্য বিক্রির লোভনীয় অফার ছড়িয়ে দেয়। এই চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলোভিত হয়ে মানুষ যখন অগ্রিম টাকা পরিশোধ করে, তারপর দেখা যায় সেই পণ্যের আর কোনো হদিস থাকে না।
সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে অনেক বিতর্কিত বা ভুয়া প্রতিষ্ঠান বিখ্যাত ব্যক্তি, সেলিব্রিটি কিংবা নামী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে বিজ্ঞাপন করায়। প্রিয় তারকাদের দেখে মানুষও অন্ধের মতো বিশ্বাস করে ফাঁদে পা দেয়।
আজকাল আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে নামী ব্র্যান্ডের লোগো ও ওয়েবসাইট হুবহু নকল করার চল শুরু হয়েছে। এমনকি সেলিব্রিটিদের কণ্ঠ ও চেহারা এআই-এর মাধ্যমে ক্লোন বা ডিপফেক করে এমনভাবে ভুয়া অফার ছড়ানো হচ্ছে যে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকল চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অনেক সময় প্রতিষ্ঠান সরাসরি টাকা মারে না, কিন্তু অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের ডিজাইন এমনভাবে করে যা গ্রাহককে বিভ্রান্ত করে। যেমন—শেষ মুহূর্তে ‘প্রসেসিং ফি’ বা ‘প্যাকিং চার্জ’ নামে কিছু গোপন খরচ যোগ করে দেওয়া হয়। আবার কৃত্রিমভাবে “মাত্র ১টি পণ্য বাকি আছে” বা “অফারটি শেষ হতে ৫ মিনিট বাকি” এমন ভুয়া তাগিদ তৈরি করে ক্রেতাকে দ্রুত পেমেন্ট করতে বাধ্য করা হয়।
পণ্য ডেলিভারির আগেই সম্পূর্ণ বা বড় অঙ্কের অর্থ অগ্রিম পরিশোধের শর্ত দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর কাস্টমার সার্ভিস নম্বর বন্ধ বা সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকে গ্রাহককে ব্লক করে দেওয়ার ঘটনা তো নিত্যদিনের। কিছু চক্র আসল ই-কমার্স সাইটের মতো দেখতে হুবহু ভুয়া বা ফিশিং সাইট তৈরি করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য, যেমন পিন বা ওটিপি চুরি করে নেয়। বড় অঙ্কের টাকা জমা হওয়ার পর তারা মূল প্ল্যাটফর্মটি হঠাৎ বন্ধ করে গায়েব হয়ে যায়।
সেখানে পণ্য বিক্রির চেয়ে নতুন গ্রাহক যোগ করিয়ে অবাস্তব লাভের প্রলোভন দেখানোই প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। এর বাইরে ছবিতে পণ্যের গুণগত মান চমৎকার দেখালেও বাস্তবে অত্যন্ত নিম্নমানের বা সম্পূর্ণ ভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা এবং ডেলিভারির জন্য মাসের পর মাস অতিরিক্ত সময় নিয়ে গ্রাহককে আর্থিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার ঘটনা তো রয়েছেই। লজিস্টিকস বা কুরিয়ার জালিয়াতির মাধ্যমে কুরিয়ার বক্সের ভেতরে ইট-পাথর বা বালি ভরে গ্রাহকের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে বক্স খোলার আগেই কুরিয়ার প্রতিনিধি টাকা নিয়ে চলে যায় এবং গ্রাহককে জিম্মি হতে হয়।
আবার ই-কমার্সের মোড়কে এক ধরণের অবৈধ এমএলএম বা পিরামিড স্কিমের মতো পঞ্জি ব্যবসাও চলছে। সেখানে পণ্য বিক্রির চেয়ে নতুন গ্রাহক যোগ করিয়ে অবাস্তব লাভের প্রলোভন দেখানোই প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। এর বাইরে ছবিতে পণ্যের গুণগত মান চমৎকার দেখালেও বাস্তবে অত্যন্ত নিম্নমানের বা সম্পূর্ণ ভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা।
ডেলিভারির জন্য মাসের পর মাস অতিরিক্ত সময় নিয়ে গ্রাহককে আর্থিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার ঘটনা তো রয়েছেই। লজিস্টিকস বা কুরিয়ার জালিয়াতির মাধ্যমে কুরিয়ার বক্সের ভেতরে ইট-পাথর বা বালি ভরে গ্রাহকের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে বক্স খোলার আগেই কুরিয়ার প্রতিনিধি টাকা নিয়ে চলে যায় এবং গ্রাহককে জিম্মি হতে হয়।
ক্রেতাদের সুরক্ষায় বাস্তবসম্মত করণীয়
১, এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে কেনাকাটার আগে পেজ বা ওয়েবসাইটের ট্রান্সপারেন্সি বা তৈরির তারিখ এবং অন্যান্য গ্রাহকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ভালো করে যাচাই করতে হবে। বিখ্যাত ব্র্যান্ডের নামের বানান ও লোগো সঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করা জরুরি।
২, অস্বাভাবিক উচ্চ ছাড় বা অবাস্তব ক্যাশব্যাক অফার দেখলে তাৎক্ষণিক লোভ পরিহার করে সতর্ক হতে হবে। অপরিচিত বা নতুন সাইটের ক্ষেত্রে সবসময় ক্যাশ অন ডেলিভারি এবং সম্ভব হলে “ওপেন বক্স ডেলিভারি” বা পণ্য দেখে নেওয়ার সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করা উচিত।
৩, বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত এসক্রো গেটওয়ে ব্যবহারের চেষ্টা করা যেতে পারে, যেখানে ক্রেতার পরিশোধিত অর্থ তৃতীয় পক্ষের কাছে জমা থাকে এবং পণ্য হাতে পাওয়ার পর সেই অর্থ বিক্রেতা পান।
৪, ইমেইল, এসএমএস বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা কোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ এগুলো ফিশিং বা ম্যালওয়্যার হতে পারে।
৫, কেনাকাটার আগে সাইটের গোপনীয়তা নীতি এবং রিটার্ন বা রিফান্ড শর্তাবলী ভালোভাবে পড়ে নেওয়া ভালো। আর প্রতারিত হলে চুপ না থেকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার ক্রাইম ইউনিট, বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে দ্রুত তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
লেখক– উদ্যোক্তা, বিশ্লেষক, সিইও, কিনলে ডট কম



