টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন দেশের তরুণরা এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে। আমাদের তরুণরা প্রযুক্তির ব্যবহারকারী থেকে প্রযুক্তির উদ্ভাবকে পরিণত হবে। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, সততা, সৃজনশীলতা এবং দেশপ্রেমই আগামীর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মন্ত্রী শনিবার, ৮ আগস্ট গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ এর ক্যাম্পাসে RoboFusion 1.0 – National Robotics Festival এ প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আমাদের তরুণরা প্রযুক্তির ব্যবহারকারী থেকে প্রযুক্তির উদ্ভাবকে পরিণত হবে। সে লক্ষ্যেই আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
ফকির মাহবুব আনাম জানান, আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং উদ্ভাবনকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। আর সে লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা সৃষ্টি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল পাঠদান বা ডিগ্রি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এগুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং Industry-Academia সহযোগিতার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সাফল্যের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবন মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সেই ভূমিকা আরও শক্তিশালীভাবে পালন করতে হবে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বিশ্ব আজ প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এক অভূতপূর্ব সময় অতিক্রম করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), রোবোটিক্স, অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার সিকিউরিটি, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আগামী দিনের অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি নির্ধারণ করছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের অংশীদার।
মন্ত্রী জানান, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি কর্তৃক, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রযুক্তি শিক্ষা, গবেষণা, রোবোটিক্স, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে আজকের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রী আরও বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি সম্প্রসারণে – সবার জন্য ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করণ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এ আই) টেকনোলজি, রোবোটিক্স, ন্যানোটেকনোলজি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে আমরা বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। যেগুলো বাস্তবায়িত হলে আমাদের এ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং আমরা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবো।
মন্ত্রী উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, তোমাদের জন্য প্রয়োজন গবেষণা ও উদ্ভাবন। প্রযুক্তিকে শুধু ব্যবহার করো না; প্রযুক্তি উদ্ভাবন করো। তোমাদের গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে আসুক নতুন প্রযুক্তি। তোমাদের উদ্ভাবন থেকেই জন্ম নিক নতুন স্টার্টআপ। আমাদের প্রয়োজন এমন তরুণ, যারা শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত হবে না; বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, প্রযুক্ত ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার পরিচয় তুলে ধরবে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সরকার প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে—গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহ প্রদান, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি, University-Academia সহযোগিতা বৃদ্ধি, Artificial Intelligence ও Emerging Technologies সম্প্রসারণ,সরকারি সেবা সহজীকরণ ও সম্প্রসারণ,ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এগুলোকে স্টার্টআপের মাধ্যমে সফলতা প্রদান। এসব ক্ষেত্রে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে।
মন্ত্রী জানান, আপনার নিশ্চয়ই অবগত আছেন, ছোট ছোট উদ্ভাবন গুলোকে সফল উদ্যোগে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড ঘোষণা করেছেন। যে ফান্ড ব্যবহার করে আমরা প্রত্যেকটি সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনকে – উদ্যোগে রূপান্তর করে তার সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারবো।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে একটি শক্তিশালী উদ্ভাবন-ইকোসিস্টেম নির্মাণে আমরা কাজ করছি। RoboFusion 1.0-এর মতো আয়োজন আমাদের সেই অঙ্গীকারকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, যেসব কোম্পানী হাইটেক পার্কে জায়গা বরাদ্দ নিয়ে এখন পর্যন্ত ইন্ড্রাস্ট্রি গড়ে তোলেনি তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
তিনি বলেন, গাজীপুর কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক টি আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ফ্লাগশিপ হাইটেক পার্ক। এটিতে বিনিয়োগের জন্য ইউরোপ, চায়নাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে, তাদেরকে এই পার্কে আমাদের জায়গা দিতে হবে।
ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ এর জন্য স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে মন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেন।
ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোক্তার আলী’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি’র বক্তৃতা করেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ মজিবুর রহমান,
ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ এর সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড.মো: আবু ইউসুফ,
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূইয়া, ইউনিভার্সিটি অফ ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ এর সিন্ডিকেট সদস্য এম এ মুবিন খান প্রমুখ। স্থানীয় সংসদ সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়টি জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জোর দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিল্পখাতের প্রতিনিধিবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ; দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, উদ্ভাবক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী, UFTB Robotics Club এর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।


