টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : মহাকাশ সবসময়ই রহস্যে ঘেরা, আর এই রহস্য উন্মোচনে মানুষ দশকের পর দশক ধরে শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও মহাকাশযান পাঠাচ্ছে । তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশ ভ্রমণ কেবল মহাজাগতিক রহস্যই উন্মোচন করছে না, বরং এটি মানুষের শরীরেও স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসছে। যমজ দুই ভাইকে নিয়ে করা নাসার একটি ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে এই চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে।
ঐতিহাসিক যমজ ভাইদের গবেষণা
নাসার নভোচারী স্কট কেলি এবং তার অবিকল যমজ ভাই মার্ক কেলিকে (যিনি নিজেও একজন নভোচারী) নিয়ে এই গবেষণাটি করা হয়। ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ থেকে ২০১৬ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১ বছর ব্যাপী (৩৪০ দিন) এই মিশন চলে। স্কট কেলি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করেন, অন্যদিকে তার ভাই মার্ক কেলি পৃথিবীতেই থেকে যান। এই পুরো সময়জুড়ে নাসা উভয়ের শরীর থেকে বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করে। ২০১৯ সালে এই গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
শরীরে যেসব পরিবর্তন দেখা গেছে
গবেষণায় দেখা যায়, মহাকাশে থাকার কারণে স্কট কেলির উচ্চতা কিছুটা বৃদ্ধি পায়, তার পেশির ভর কমে যায় (যা মহাকাশচারীদের জন্য একটি সাধারণ সমস্যা) এবং পৃথিবীতে থাকা তার ভাইয়ের চেয়ে তার বয়সের গতি কিছুটা ধীর হয়ে যায়। গবেষকদের মতে, স্কট এবং তার ভাইয়ের মধ্যকার বয়সের ব্যবধান মাত্র ৫ মিলি সেকেন্ডের মতো পরিবর্তন হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় চমক ছিল স্কটের জিনের প্রকাশ বা ‘জিন এক্সপ্রেশন’ এর ক্ষেত্রে। পৃথিবীতে ফিরে আসার ৬ মাস পরও দেখা গেছে যে, স্কটের শরীরের প্রায় ৭ শতাংশ জিনের কার্যপদ্ধতি স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
ক্রোমোজোম ও ডিএনএ-র পরিবর্তন
গবেষকরা স্কট কেলির শরীরে শারীরবৃত্তীয় এবং আণবিক—উভয় স্তরেই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। এর মধ্যে জিনের কার্যকারিতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক দক্ষতার পরিবর্তন অন্যতম।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি দেখা গেছে তাদের ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে থাকা ‘টেলোমেয়ার’ (Telomeres)-এ, যা মানুষের বার্ধক্যের সাথে জড়িত। সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে টেলোমেয়ার ছোট হতে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, মহাকাশে থাকাকালীন স্কটের টেলোমেয়ারগুলো লম্বা হয়ে গিয়েছিল, যা বার্ধক্যের গতি ধীর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
যদিও পৃথিবীতে ফেরার পর সেগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। তবে ফিরে আসার ছয় মাস পরেও স্কটের শরীরের ৮১১টি জিন পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়নি, যার বেশির ভাগই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ডিএনএ মেরামতের (DNA repair) সাথে সম্পর্কিত ছিল।
ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের ওপর প্রভাব
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, স্কট কেলির নির্ভুলতা ও গতি সংক্রান্ত জ্ঞানীয় দক্ষতা বা মানসিক সক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল এবং পৃথিবীতে ফেরার পরও তা বজায় ছিল। দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ মিশনে নভোচারীদের সুরক্ষায় নতুন ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা কতটা জরুরি, এই গবেষণাটি তা প্রমাণ করে।
যেহেতু এই গবেষণাটি শুধুমাত্র এক জোড়া যমজ ভাইয়ের ওপর করা হয়েছে, তাই বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে এই ফলাফল সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। তবে মঙ্গল গ্রহ বা তার চেয়েও দূরের কোনো দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নাসার বিজ্ঞানীদের জন্য এই গবেষণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন হিসেবে কাজ করছে।



