টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : অনলাইনের অত্যাধুনিক বয়স যাচাইকরণ প্রযুক্তি ফাঁকি দিতে শিশুরা এক অদ্ভুত এবং হাস্যকর কৌশল বেছে নিয়েছে। যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শিশু মুখে নকল গোঁফ এঁকে অনলাইনের বয়স নির্ধারণকারী প্রযুক্তিকে অনায়াসেই বোকা বানিয়ে দিচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কোটি কোটি ডলার খরচ করে বানানো সুরক্ষাব্যবস্থা সাধারণ একটি মেকআপ পেন্সিলের কাছে হেরে যাওয়ায় বিষয়টি ইন্টারনেটে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উইয়ার্ড (WIRED) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এই তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের চাইল্ড সেফটি বা অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা ‘ইন্টারনেট ম্যাটার্স’ (Internet Matters)-এর একটি জরিপ থেকে এই তথ্য সামনে আসে। সংস্থাটি প্রায় ১,০০০ শিশু এবং তাদের অভিভাবকদের ওপর এই জরিপ চালায়।
সেখানে এক মা জানান, তিনি তার ১২ বছর বয়সী ছেলেকে আইব্রো পেন্সিল দিয়ে মুখে নকল গোঁফ আঁকতে দেখেন। সেই নকল গোঁফ নিয়ে ছেলেটি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে অনলাইনের অটোমেটেড বয়স যাচাইকরণ টুলটি তাকে ১৫ বছর বয়সী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং সে অনায়াসেই বড়দের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করার অনুমতি পেয়ে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট ২০২৩’-এর অধীনে সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং এবং অন্যান্য সংবেদনশীল প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনেক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর বয়স অনুমান করার জন্য ফেসিয়াল অ্যানালিসিস বা সেলফি-ভিত্তিক এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
কিন্তু শিশুরা খুব দ্রুতই এই প্রযুক্তির দুর্বলতা খুঁজে বের করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিশুই মনে করে যে অনলাইনের বয়স যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ফাঁকি দেওয়া খুবই সহজ এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু স্বীকার করেছে যে তারা কোনো না কোনো উপায়ে এটি করেছে।
মুখে নকল গোঁফ আঁকা ছাড়াও শিশুরা এই সুরক্ষাপ্রাচীর পার হতে আরও নানা রকম বুদ্ধি খাটুচ্ছে। অনেকে বাবা-মা বা বড় ভাইবোনের আইডি ব্যবহার করছে, ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করে আঞ্চলিক নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে, আবার কেউ কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে নিজের ছবি এডিট করে বয়স বাড়িয়ে নিচ্ছে। এমনকি ভিডিও গেমের বয়স্ক চরিত্রের নড়াচড়ার ক্লিপ ক্যামেরার সামনে ধরেও সিস্টেমকে ফাঁকি দেওয়ার নজির মিলেছে।
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা নিজেই সন্তানদের এই নিয়ম ভাঙতে সাহায্য করছেন। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ১৭ শতাংশ বাবা-মা তাদের সন্তানদের বয়স যাচাইকরণ প্রক্রিয়া এড়াতে সরাসরি সাহায্য করেন এবং ৯ শতাংশ অভিভাবক বিষয়টি জেনেও চোখ বন্ধ করে রাখেন।
অনেক অভিভাবক জানান, সন্তানরা কোন গেম খেলছে বা কী দেখছে সে বিষয়ে তারা নিজেরা সচেতন এবং তারা নিজেরা পাশে থেকে এটি তদারকি করেন বলেই সন্তানদের এই অনুমতি দেন।
এই ঘটনাটি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা ফেসিয়াল রিকগনিশন বা বয়স অনুমানকারী সিস্টেমগুলো যে কতটা নাজুক, তা এই সাধারণ ‘গোঁফ কৌশল’ প্রমাণ করে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল ভিজ্যুয়াল বা বাহ্যিক চেহারার ওপর নির্ভর করে বয়স নির্ধারণের প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়; বরং ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা বজায় রেখে আরও শক্তিশালী ও নিরেট কোনো পরিচয় যাচাইকরণ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।


