টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে সব বড় বড় প্রযুক্তি ও গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, ঠিক তখনই ব্যতিক্রমী ও বড় এক ধাক্কা খেলো মার্কিন গাড়ি প্রস্তুতকারক জায়ান্ট মোটর কোম্পানি ফোর্ড ।
গাড়ি ডিজাইন এবং মান নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আশানুরূপ সাফল্য না পাওয়ায়, প্রতিষ্ঠানটি তাদের চাকরিচ্যুত বা অবসরে যাওয়া ৩৫০ জন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ‘গ্রে বিয়ার্ড’ (পাকা চুল-দাড়িওয়ালা প্রবীণ প্রকৌশলী) ইঞ্জিনিয়ারকে পুনরায় চাকরিতে নিয়োগ করেছে।
ফোর্ড স্বীকার করেছে যে, শুধুমাত্র এআই দিয়ে অভিজ্ঞ মানুষের মেধা ও বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
ফোর্ডের প্রধান নির্বাহী জিম ফার্লি এর আগে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এআই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক হোয়াইট কলার (অফিসিয়াল) চাকরি প্রতিস্থাপন করবে। কিন্তু ফোর্ডের এই নিজস্ব গুণগত মানের সংকট প্রমাণ করেছে যে, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষের তদারকি কতটা অপরিহার্য।
ফোর্ডের ভুল ও এআই-এর সীমাবদ্ধতা
ফোর্ডের ভেহিকেল হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস পুন সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ভুলবশত ভেবেছিলাম যে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করে এবং আমাদের ডিজাইনের প্রয়োজনীয়তাগুলো ইনপুট দিলেই একটি উচ্চমানের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। কিন্তু এআই একটি চমৎকার টুল বা মাধ্যম হলেও, এটি ঠিক ততটুকুই ভালো ফলাফল দিতে পারে—যতটুকু ভালো ডাটা দিয়ে এটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।”
তিনি আরও জানান, গত কয়েক বছরে ফোর্ড তাদের বহু অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারকে ছাঁটাই করে বা তারা অবসরে চলে যান। ফলে তাদের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের যে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ছিল, তা এআই সিস্টেমের ডাটা পাইপলাইনে সঠিকভাবে যুক্ত করার আগেই তারা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান। ফলস্বরূপ, ফোর্ডের স্বয়ংক্রিয় এআই টুলগুলো গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি বা ডিজাইন ফ্ল (Design flaws) ধরার পরিবর্তে উল্টো সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তুলছিল।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন মতে , কোম্পানির চিফ অপারেটিং অফিসার কুমার গালহোত্রা সাংবাদিকদের বলেছেন যে, “স্বয়ংক্রিয় গুণমান ব্যবস্থার উপর ক্রমশ বেশি নির্ভর করে ফোর্ড হতাশাজনক ফলাফল দিচ্ছিলো । তাই কোম্পানিটি “প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের ফিরিয়ে এনেছে এবং সেই বিশেষজ্ঞরা কোনো যন্ত্রাংশ কারখানায় পৌঁছানোর আগেই তার ত্রুটির স্থানগুলো খুঁজে বের করেন।
বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি ও গুণগত মানের সংকট
শুধুমাত্র এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফোর্ডকে গুণগত মান নিয়ে বেশ বড় সংকটে পড়তে হয়েছিল। ২০২৬ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত কোম্পানিটিকে ত্রুটিযুক্ত গাড়ি বাজার থেকে তুলে নেওয়ার জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলার লোকসান গুনতে হয়।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই ধাপে ধাপে প্রায় ৩৫০ জন অভিজ্ঞ কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও ইঞ্জিনিয়ারকে নতুন করে যুক্ত বা পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
এই প্রবীণ ইঞ্জিনিয়ারদের মূল কাজ হলো— জুনিয়র কর্মীদের মেন্টরিং বা পরামর্শ দেওয়া, গাড়ির পার্টস কারখানায় তৈরি হওয়ার আগেই নিখুঁতভাবে সেগুলোর ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং এআই ও ডায়াগনস্টিক সফটওয়্যারগুলোকে নতুন করে রিপ্রোগ্রাম করা।
প্রবীণ প্রকৌশলীদের এই ‘অভিজ্ঞতার ছোঁয়া’ পাওয়ার পর ফোর্ড খুব দ্রুত এর সুফল পেতে শুরু করেছে। স্বনামধন্য গাড়ি মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘জে.ডি. পাওয়ার’ এর প্রাথমিক গুণগত মান জরিপে ফোর্ড এই সপ্তাহে বিগত ১৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মূল ধারার ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে।
ফোর্ড কর্তৃপক্ষ সরাসরি এই সাফল্যের কৃতিত্ব দিয়েছেন তাদের ফিরে আসা প্রবীণ প্রকৌশলীদের মেধা ও তদারকিকে।
বড় বার্তা প্রযুক্তি বাজারের জন্য
শুধু ফোর্ডই নয়, বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে—এআই-এর ওপর ভরসা করে কর্মী ছাঁটাই করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রায় ৩৫.৬% কোম্পানি পরবর্তীতে তাদের ভুল বুঝতে পেরে আবারও পুরোনো কর্মীদের ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে।
ফোর্ডের এই ঘটনাটি প্রযুক্তি এবং অটোমোবাইল খাতের জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের বছরের পর বছর ধরে অর্জিত প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই।


