সোহেল মৃধা : সমকালীন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধারার ব্যবসা তথা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিকাশ ঘটছে এক অভূতপূর্ব গতিতে। আর্থিক প্রযুক্তি, ই-কমার্স কিংবা লজিস্টিকস খাতের জোয়ারে তরুণ উদ্যোক্তারা যখন নিত্যনতুন উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে আসছেন, ঠিক তখনই দেশের অটোমোবাইল রক্ষণাবেক্ষণের মতো প্রাক-ডিজিটাল ও অসংগঠিত খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক সাহসী উদ্যোগ নিয়েছে উদীয়মান টেক-প্ল্যাটফর্ম ‘যান্ত্রিক’ (Zantrik)।
২০১৬ সালে দূরদর্শী উদ্যোক্তা আল-ফারুক শুভ এবং তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লব চন্দ্র বিশ্বাসএর হাত ধরে যাত্রা শুরু করা এই ওয়ান-স্টপ প্ল্যাটফর্মটি গাড়ি কেনাবেচা, অন-ডিমান্ড রোডসাইড অ্যাসিস্ট্যান্স এবং নিয়মিত ভেহিকেল মেইনটেইন্যান্সের যাবতীয় সেবাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল আম্ব্রেলার নিচে নিয়ে এসেছে, যা দেশের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা করেছে।
১. অটোমোবাইল খাতের বাজার পরিধি ও যান্ত্রিক-এর অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটর যানের সংখ্যা ৬০ লাখের (৬ মিলিয়ন) মাইলফলক স্পর্শ করেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান *Digital Commerce Research and Advocacy Forum (DCRAF)-এর বাজার বিশ্লেষণ ও কৌশলগত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অটোমোবাইল আফটার-মার্কেট (যন্ত্রাংশ, লুব্রিকেন্ট ও সার্ভিসিং) খাতের বার্ষিক বাজার মূল্য প্রায় *২৫,০০০ কোটি টাকা (অনূর্ধ্ব ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
এই বিপুল সম্ভাবনাময় বাজারের ৮৫ শতাংশের অধিক অংশ এখনো প্রথাগত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে, যেখানে সাধারণ গাড়ি মালিকদের প্রতিনিয়ত মানহীন সেবা ও তথ্যের অস্বচ্ছতার মুখোমুখি হতে হয়। এই কাঠামোগত শূন্যতাকে দূর করতে যান্ত্রিক তাদের প্রযুক্তিগত সমাধানকে বিস্তৃত করেছে:-
দেশব্যাপী কৌশলগত নেটওয়ার্ক: যান্ত্রিক ইতিমধ্যে দেশের প্রধান প্রধান শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ৫০০-এরও বেশি সার্টিফাইড ওয়ার্কশপ ও দক্ষ টেকনিশিয়ানদের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা : প্রথাগত গ্যারেজ সংস্কৃতির বিপরীতে যান্ত্রিক তাদের অ্যাপে প্রতিটি সেবার মানদণ্ড এবং প্রমিত মূল্যতালিকা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যা গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূরীকরণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করছে।
২. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) আধুনিকায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
যান্ত্রিক-এর সামগ্রিক বিজনেস মডেলের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর টেকসই সামাজিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব, যা তৃণমূল পর্যায়ের প্রান্তিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ঘটাচ্ছে :
স্মার্ট এসএমই (SME) উদ্যোক্তা উন্নয়ন: স্থানীয় পর্যায়ের ছোট ছোট গ্যারেজ মালিকদের, যারা মূলত দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের চালিকাশক্তি, যান্ত্রিক তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একীভূত করেছে।
*DCRAF-এর ডেটা অ্যানালাইসিস নির্দেশ করে যে, এই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ফলে উক্ত ওয়ার্কশপগুলোর মাসিক নিট মুনাফা গড়ে *৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন: প্রথাগত মেকানিকদের আধুনিক যুগের ইলেকট্রনিক ও সেন্সর-ভিত্তিক গাড়িগুলোর ডায়াগনস্টিকস আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে চিহ্নিত করার ওপর বিশেষায়িত ট্রেনিং প্রদান করছে এই প্রতিষ্ঠান, যা দেশের কারিগরি জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরাসরি অবদান রাখছে।
৩. ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ: ওয়ান-স্টপ প্ল্যাটফর্মের পরিধি ও ফ্রন্টলাইন টেকনোলজির প্রয়োগ।
দেশীয় বাজারের শীর্ষস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছাতে যান্ত্রিক তাদের কৌশলগত পরিকল্পনাকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করছে :
তথ্যভিত্তিক গাড়ি কেনাবেচা (Data-driven Marketplace): সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি কেনাবেচার বাজারে বিদ্যমান তথ্যের অসমতা ও জালিয়াতি রোধে যান্ত্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং শতভাগ যাচাইকৃত হিস্ট্রি ডেটা ব্যবহার করে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ সেকেন্ড-হ্যান্ড কার মার্কেটপ্লেস গড়ে তোলার কাজ করছে।
স্মার্ট ভেহিকেল ট্র্যাকিং এবং আইওটি (IoT) সলিউশন: গাড়ির ইঞ্জিনের রিয়েল-টাইম স্বাস্থ্য ও মেকানিক্যাল কন্ডিশন ট্র্যাক করার জন্য তারা বিশেষ আইওটি (Internet of Things) ডিভাইস ইন্টিগ্রেশনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যা সম্ভাব্য দুর্ঘটনার পূর্বেই চালককে প্রেডিক্টিভ অ্যালার্ট প্রদান করবে।
মহাসড়কে ইমার্জেন্সি রেসপন্স: জাতীয় মহাসড়কগুলোতে আকস্মিক যান্ত্রিক বিকলতার ক্ষেত্রে জরুরি উদ্ধার ও হাইওয়ে মেকানিক্যাল সাপোর্ট আরও বেগবান করতে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময়কে অনূর্ধ্ব ৩০ মিনিটে নামিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
৪. বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও গ্লোবাল ইনভেস্টরদের আকর্ষণ।
গ্লোবাল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC) এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পরিভাষায় যান্ত্রিক বর্তমানে দেশের অন্যতম সেরা একটি বিনিয়োগের ক্ষেত্র:
৩ বিলিয়ন ডলারের ব্লু-ওশান মার্কেট: বাংলাদেশের অটোমোবাইল মেরামত খাতের আকার এখন ৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করছে, যা সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত এবং বার্ষিক ১০% থেকে ১২% চক্রবৃদ্ধি হারে (CAGR) বর্ধনশীল।
হাইলি স্কেলেবল অ্যাসেট-লাইট (Asset-Light) মডেল: যান্ত্রিকের নিজস্ব কোনো বিশাল গ্যারেজ বা রিয়েল এস্টেট রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক খরচ নেই। ফলে ব্যবসা যত দ্রুত স্কেল করবে, ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (CapEx) সেভাবে বাড়বে না, যা কোম্পানির প্রফিট মার্জিনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কাস্টমার লাইফটাইম ভ্যালু (LTV) ও রেকারিং রেভিনিউ: একটি যানবাহন বছরে গড়ে ৩ থেকে ৪ বার অবধারিতভাবে মেইনটেইন্যান্স বা টিউনিংয়ের মুখোমুখি হয়। এই হাই-রেকারিং রেভিনিউ মডেলটি স্টার্টআপের ব্যবসায়িক ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনে।
৫. নতুন স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য কেস স্টাডি এবং ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
বাংলাদেশের উদীয়মান নতুন উদ্যোক্তা কিংবা যারা পলিসি লেভেলে কাজ করছেন, তাদের জন্য ‘যান্ত্রিক’ একটি ক্লাসিক বিজনেস কেস স্টাডি:
সম্পৃক্ত বাজার বনাম প্রথাগত খাতের রূপান্তর: অধিকাংশ নতুন স্টার্টআপ ক্যাশ-বার্নিং বাজারে প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু যান্ত্রিক প্রমাণ করেছে যে, অত্যন্ত কঠিন, প্রথাগত এবং প্রযুক্তিবিমুখ ব্যাক এন্ড খাতগুলোতেও ইনোভেশনের মাধ্যমে একটি লাভজনক ও টেকসই বিজনেস সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব।
রিসার্চ ও পলিসি অ্যাডভোকেসির অপরিহার্যতা: এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত অটোমোবাইল খাতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিধি, প্রবৃদ্ধির হার ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কিত প্রতিটি উপাত্ত ও পরিসংখ্যান Digital Commerce Research and Advocacy Forum (DCRAF)-এর নিবিড় প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মাধ্যমে সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত।
যে কোনো নতুন স্টার্টআপের টেকসই প্রবৃদ্ধি বা সরকারের জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পলিসি অ্যাডভোকেসির ক্ষেত্রে ডেটা এবং সঠিক বাজার গবেষণা যে কতটা অনস্বীকার্য, তা এই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে এক দশকের এই দীর্ঘ যাত্রায় যান্ত্রিক কেবল একটি সাধারণ গাড়ি মেরামতের অ্যাপ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি বাংলাদেশের প্রথাগত সেবা খাতকে একটি আধুনিক ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার সফলতম নজির স্থাপন করেছে।
বর্তমান সরকারের ‘স্মার্ট ইকোনমি রোডম্যাপ’ বিনির্মাণে এবং দেশের সামগ্রিক জিডিপিতে অসংগঠিত খাতকে মূলধারায় যুক্ত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যান্ত্রিক-এর মতো সম্ভাবনাময় হাই-গ্রোথ স্টার্টআপ এবং DCRAF-এর মতো গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী ফোরামের যৌথ ভূমিকা আগামী দিনের স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে অনস্বীকার্য অবদান রাখবে।
লেখক পরিচিতি – উদ্যোক্তা , ফাউন্ডার , সিইও কিনলে ডট কম , বিশ্লেষক


