টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : ডিজিটাল যুগের অনলাইন জুয়া ও প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক প্রতারণা রুখতে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিতে পাস হয়েছে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’।
নতুন এই আইনে অপরাধের ধরন বিবেচনা করে ১৪ ধরনের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার উল্লেখ রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১৫৯ বছরের পুরোনো ‘The Public Gambling Act, 1867’ বাতিল করা হলো।
মঙ্গলবার , ৩০ জুন, স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এর আগে গত ২৩ জুন বিলটি সংসদে তোলার পর তা পরীক্ষা করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল।
বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো আগের আইনটি বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া মোকাবিলায় যথেষ্ট ছিল না। বর্তমানে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সি জুয়া, ভিপিএন ব্যবহার, ভুয়া সিম ও ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আর্থিক প্রতারণা ও অর্থপাচার হচ্ছে।
এগুলো দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও তরুণ সমাজের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই রাষ্ট্রের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই আধুনিক আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন আইনে শাস্তির বিধানসমূহ:
আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জুয়ায় সম্পৃক্ততা, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, জুয়ার বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মতো ১৪টি অপরাধ সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। অপরাধভেদে শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে নিম্নরূপ:
জুয়ার সামগ্রী প্রস্তুত ও সরবরাহ: সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।
সাধারণ জুয়া: সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া: সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
অনলাইন বেটিং (বাজি ধরা): সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
জুয়ার স্থান পরিচালনা: সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৪ লাখ টাকা জরিমানা। পাশাপাশি আদালতের আদেশে জুয়ায় ব্যবহৃত ভবন, যানবাহন, সার্ভার অবকাঠামো বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থা ও টাস্কফোর্স গঠন:
নতুন আইনে জুয়া ও বেটিং-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া পেজ বা গ্রুপ ব্লক এবং নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জুয়ায় ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে ফ্রিজ বা বন্ধ করার নির্দেশনা দিতে পারবেন আদালত।
অপরাধ প্রতিরোধে একটি ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ’ তৈরি, এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে একটি ‘আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স’ গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে এই আইনে।
সরকার আশা করছে, এই আইনটি কার্যকরের মাধ্যমে দেশে ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা ও অর্থপাচার বন্ধে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে।



