সোহেল মৃধাঃ বর্তমান নির্বাচিত সরকারের মূল রাষ্ট্রীয় ভাবনা, অর্থনৈতিক দর্শন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রধান প্রতিপাদ্য হলো “সবার আগে বাংলাদেশ”। এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করা, দেশীয় তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আইনি ও কাঠামোগত সুরক্ষা দেওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এই জাতীয় অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকেই দেশের সামগ্রিক লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্মার্ট এবং ক্যাশলেস করার জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট আর্কিটেকচার গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ই-কমার্স এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি (MSME) উদ্যোক্তাদের মধ্যে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, একটি বড় ধরণের বিভ্রান্তি ও নীতিগত ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে—”নতুন ট্রেড লাইসেন্স করতে বা পুরানো লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলে এখন থেকে বাংলা কিউআর কোড বাধ্যতামূলকভাবে লাগবে, আবার ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাংলা কিউআর কোড নিতে গেলে আগে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স দেখাতে হবে।” এই পরস্পরবিরোধী প্রচারণার কারণে মাঠপর্যায়ের এবং অনলাইন উদ্যোক্তারা এক ধরণের অন্তহীন আমলাতান্ত্রিক লুপ বা গোলকধাঁধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন।
বাস্তব সত্য হলো, সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি নির্দেশনা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, একমুখী এবং সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত। এখানে কোনো অন্তহীন আইনি লুপ বা গোলকধাঁধা নেই; বরং এটি দেশের সাধারণ ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের দৈনিক লেনদেন খরচ কমিয়ে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার একটি অত্যন্ত সরল ও প্রগতিশীল প্রক্রিয়া।
১। ‘বাংলা কিউআর’ এর আসল উদ্দেশ্য ও আইনি বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট (PSD) দেশের প্রচলিত খুচরা ও প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন ব্যবস্থাকে একটি একক এবং সার্বজনীন কাঠামোর আওতায় আনতে “বাংলা কিউআর” (Bangla QR) প্রবর্তন করেছে। আইনি সূত্র ও বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ ব্যাংক PSD সার্কুলার নম্বর- ০২/২০২৩ (তারিখ: বাংলা কিউআর বনাম ট্রেড লাইসেন্স গোলকধাঁধা: অনলাইন ও এমএসএমই ব্যবসার আইনি গাইডলাইন।
বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত বিভ্রান্তির অবসান
বর্তমান নির্বাচিত সরকারের মূল রাষ্ট্রীয় ভাবনা, অর্থনৈতিক দর্শন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রধান প্রতিপাদ্য হলো “সবার আগে বাংলাদেশ”। এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ বাজারকে শক্তিশালী করা, দেশীয় তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আইনি ও কাঠামোগত সুরক্ষা দেওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এই জাতীয় অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকেই দেশের সামগ্রিক লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্মার্ট এবং ক্যাশলেস করার জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট আর্কিটেকচার গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ই-কমার্স এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি (MSME) উদ্যোক্তাদের মধ্যে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, একটি বড় ধরণের বিভ্রান্তি ও নীতিগত ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে—”নতুন ট্রেড লাইসেন্স করতে বা পুরানো লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলে এখন থেকে বাংলা কিউআর কোড বাধ্যতামূলকভাবে লাগবে, আবার ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাংলা কিউআর কোড নিতে গেলে আগে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স দেখাতে হবে।” এই পরস্পরবিরোধী প্রচারণার কারণে মাঠপর্যায়ের এবং অনলাইন উদ্যোক্তারা এক ধরণের অন্তহীন আমলাতান্ত্রিক লুপ বা গোলকধাঁধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন।
বাস্তব সত্য হলো, সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি নির্দেশনা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, একমুখী এবং সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত। এখানে কোনো অন্তহীন আইনি লুপ বা গোলকধাঁধা নেই; বরং এটি দেশের সাধারণ ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের দৈনিক লেনদেন খরচ কমিয়ে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার একটি অত্যন্ত সরল ও প্রগতিশীল প্রক্রিয়া।
২। ট্রেড লাইসেন্স ও কিউআর: বাস্তব প্রশাসনিক ধাপ
সোশ্যাল মিডিয়ার বিভ্রান্তির বিপরীতে এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ সরল এবং দুই ভাগে বিভক্ত:
ধাপ ১ (নিবন্ধন): ব্যবসায়ী প্রথমে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে “স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯” এবং “স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯”-এর বিধিমালা ও আদর্শ কর তফসিল অনুযায়ী স্বাভাবিক নিয়মে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়ন করবেন। স্থানীয় সরকার কোনো কিউআর কোড ছাড়া কাউকেই ট্রেড লাইসেন্স দিতে অস্বীকৃতি জানাবে না।
ধাপ ২ (সক্রিয়করণ): লাইসেন্স পাওয়ার পর, ব্যবসায়ী ক্যাশলেস ট্রানজেকশনের সরকারি বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য সেই লাইসেন্স এবং ব্যবসার নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সাবমিট করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছ থেকে ‘বাংলা কিউআর’ কোড সক্রিয় করে নেবেন।
৩. অনলাইন ও হাইব্রিড উদ্যোক্তাদের ৩টি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের “ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা, ২০২১ (সংশোধিত ২০২৩)” এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এমএসএমই নীতিমালার আলোকে ব্যবসা পরিচালনার ধরন অনুযায়ী ৩টি সুনির্দিষ্ট বিভাগ বলবৎ রয়েছে:
ক্যাটাগরি ক: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক অনলাইন উদ্যোক্তা (ঘরে বসে ব্যবসা)
যারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অফিস বা শোরুম ছাড়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করেন।
আইনি সার্কুলার ও বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ ব্যাংক PSD স্মারক নম্বর- PSD(PI)২০১/২০২০-৩৭৫৬। এই নির্দেশনার অধীনে দেশে “ব্যক্তিগত রিটেইল অ্যাকাউন্ট” (Personal Retail Account – PRA) বা মাইক্রো-মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার উদ্দেশ্য তৃণমূলের ক্ষুদ্র অনলাইন উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পেমেন্ট সিস্টেমের আওতায় আনা।
ট্রেড লাইসেন্স থেকে অব্যাহতি: এই সার্কুলার অনুযায়ী, ঘরে বসে ব্যবসা করা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট বা ‘বাংলা কিউআর’ কোড নেওয়ার জন্য কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন (DBID) লাগবে না। তারা শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে এই কোড সংগ্রহ করতে পারবেন।
ক্যাটাগরি খ: ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনলাইন উদ্যোক্তা (শোরুমবিহীন ব্র্যান্ড)
যাদের নিজস্ব সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ড নেম বা ই-কমার্স ওয়েবসাইট আছে, কিন্তু কোনো ফিজিক্যাল কাস্টমার শোরুম বা আউটলেট নেই।
আইনি বিধিমালা: ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ (সংশোধিত ২০২৩)-এর ধারা ৩.১.৪।
ঠিকানার নিয়ম শিথিলকরণ: উদ্যোক্তারা তাদের আবাসিক ঠিকানা বা হোম-অফিসের ঠিকানা ব্যবহার করেই বৈধ ই-ট্রেড লাইসেন্স এবং ডিবিআইডি (DBID) গ্রহণ করতে পারবেন। এই লাইসেন্স দেখিয়ে তারা প্রাতিষ্ঠানিক মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও বাংলা কিউআর পাবেন।
নীতিগত সংস্কারের দাবি ও বিশ্লেষণ: বাস্তব ক্ষেত্রে বিশাল সংখ্যক অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য ডিবিআইডি প্রাপ্তি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক জটিলতা। তাই “সবার আগে বাংলাদেশ” অর্থনৈতিক দর্শনকে সফল করতে এই ডিবিআইডি-কে বাধ্যতামূলক না করে সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক করা উচিত; যেন উদ্যোক্তারা শুধুমাত্র বৈধ ই-ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বাংলা কিউআর সুবিধা পেতে পারেন।
ক্যাটাগরি গ: হাইব্রিড বা ওমনিচ্যানেল ব্যবসায়ী (অনলাইন + অফলাইন দোকান)
যাদের অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনে শোরুম, আউটলেট বা বাণিজ্যিক ডিসপ্লে সেন্টার রয়েছে।
লাইসেন্সের ঠিকানা: তাদের শোরুম বা বাণিজ্যিক স্পেসের ঠিকানাতেই মূল ট্রেড লাইসেন্স ও ডিবিআইডি সম্পন্ন করতে হবে এবং কার্যক্রমে অনলাইন ও অফলাইন উভয় ব্যবসার কথা উল্লেখ থাকতে হবে।
উভয় মাধ্যমে কিউআর: অফলাইন আউটলেটের ক্যাশ কাউন্টারে ফিজিক্যাল ‘বাংলা কিউআর’ স্ট্যান্ড প্রদর্শন করতে হবে এবং অনলাইন শোরুমে পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ‘ডায়নামিক বাংলা কিউআর’ সংযুক্ত রাখতে হবে।
মূল্য ও স্টক প্রদর্শন: নির্দেশিকা ২০২১-এর ধারা ৩.৪.১ অনুযায়ী অনলাইন এবং অফলাইন—উভয় মাধ্যমেই পণ্যের মূল্য এবং স্টক সমান থাকতে হবে। অফলাইন ও অনলাইনের অফারের ভিন্নতা থাকলে তা ক্রেতার উদ্দেশ্যে স্পষ্ট শর্তাবলী (Disclaimer) আকারে উল্লেখ করতে হবে, যেন ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে।
৪. শোরুম ছাড়া অনলাইন ব্যবসায়ীদের কিউআর ব্যবহারের উপায়
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ফিজিক্যাল শোরুম না থাকা সত্ত্বেও অনলাইন ব্যবসায়ীরা দুটি পদ্ধতিতে গ্রাহকদের ক্যাশলেস পেমেন্ট সুবিধা দিতে পারবেন:
ভার্চুয়াল ডিসপ্লে: ই-কমার্স ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজের পিন পোস্ট, চেকআউট পেজ কিংবা গ্রাহকের সাথে চ্যাটিংয়ের সময় ডিজিটাল ‘বাংলা কিউআর’ কোডের ছবি বা লিংক পাঠিয়ে পেমেন্ট নেওয়া যাবে।
ডেলিভারির সময় কিউআর (QR on Delivery): হোম ডেলিভারির সময় পণ্যের ইনভয়েস, প্যাকেটের গায়ে অথবা ডেলিভারি এজেন্টের স্মার্টফোনে বা প্রিন্টেড কার্ডে প্রতিষ্ঠানের ‘বাংলা কিউআর’ কোডটি দেওয়া থাকবে, যা গ্রাহক স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে পারবেন। এটি কুরিয়ারের ক্যাশ হ্যান্ডলিংয়ের ঝুঁকি ও খরচ দুটোই বাঁচায়।
৫. পেমেন্ট গেটওয়েতে বাংলা কিউআর-এর সংযোজন ও কারিগরি নিয়ম
অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্পষ্ট কারিগরি গাইডলাইন রয়েছে।
আইনি সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক PSD-এর “গাইডলাইনস ফর অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিসেস (OPGS)”।
ডায়নামিক কিউআর (Dynamic QR): এই নির্দেশনালিপি অনুযায়ী, সব লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেমেন্ট গেটওয়ে তাদের পেমেন্ট স্ক্রিনে “Bangla QR” অপশন যুক্ত করতে বাধ্য। গ্রাহক এটি সিলেক্ট করলে গেটওয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ডায়নামিক কিউআর কোড তৈরি করবে, যেখানে ওই নির্দিষ্ট অর্ডারের টাকার অংকটি লক করা থাকবে। এর জন্য মার্চেন্টকে আলাদা কোনো কোডিং করতে হয় না।
সেটেলমেন্ট সময়সীমা: পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে পরিশোধিত টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত T+1 বা T+2 (লেনদেনের পরবর্তী ১ বা ২ কার্যদিবস) এর মধ্যে মার্চেন্টের মূল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (BEFTN/RTGS) এর মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়।
৬. পণ্য ডেলিভারির সময়সীমা ও এসক্রো (Escrow) নীতিমালা
অনলাইন কেনাকাটায় ক্রেতার নিরাপত্তা ও বাজারের ওপর আস্থা বজায় রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে পেমেন্ট ও ডেলিভারি নিয়ন্ত্রণ করে:
ডেলিভারির ডেডলাইন: অগ্রিম মূল্য পরিশোধিত পণ্যের ক্ষেত্রে একই জেলায় সর্বোচ্চ ৫ দিন এবং ভিন্ন জেলায় সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে পণ্য গ্রাহকের নিকট ডেলিভারি সম্পন্ন করতে হবে।
এসক্রো মেকানিজম: কাস্টমার অনলাইনে অগ্রিম পেমেন্ট করলে সেই টাকা সরাসরি বিক্রেতার কাছে যাবে না। টাকাটি পেমেন্ট গেটওয়ের একটি সুরক্ষিত ‘এসক্রো অ্যাকাউন্টে’ জমা থাকবে। কাস্টমার পণ্য বুঝে পাওয়ার পর ডেলিভারি কনফার্মেশন রিপোর্ট গেটওয়েতে আপলোড হলে, তবেই গেটওয়ে কর্তৃপক্ষ T+1 বা T+2 কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রেতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করে। পণ্য সময়মতো ডেলিভারি না হলে গ্রাহক স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিফান্ড পাবেন।
৭. কিউআর ও গেটওয়ে লেনদেনের খরচের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করতে এবং ব্যবসার পরিচালনা ব্যয় কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) এবং ইন্টারচেঞ্জ ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর আইনি সূত্র হলো বাংলাদেশ ব্যাংক PSD সার্কুলার নম্বর- ০৩/২০২০ (মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট ও ফি নির্ধারণ সংক্রান্ত)।
এই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিভিন্ন পেমেন্ট মাধ্যমের খরচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরাসরি ব্যাংক অথবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (MFS) মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহারের খরচ সবচেয়ে কম—সর্বোচ্চ ০.৭ শতাংশ; যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সম্পূর্ণ ফ্রি বা শূন্য শতাংশ করা হয়। অপরদিকে, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়েগুলোর নিজস্ব কারিগরি ও এসক্রো সেবার কারণে মার্চেন্টের কাছ থেকে ১.০ শতাংশ থেকে ১.৮ শতাংশ পর্যন্ত ফি কাটা হয়। আর প্রচলিত অফলাইন কার্ড সোয়াইপ পিওএস (POS) মেশিনের খরচ সবচেয়ে বেশি, যা ১.৫ শতাংশ থেকে ৩.০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
টাকা সেটেলমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর-এ তাৎক্ষণিক বা লেনদেনের পরবর্তী কার্যদিবসে (T+1) টাকা পাওয়া গেলেও, গেটওয়ে ও পিওএস মেশিনের টাকা মার্চেন্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আসতে সাধারণত ১ বা ২ কার্যদিবস (T+1 বা T+2) সময় লাগে। তবে গ্রাহক যে মাধ্যমেই পেমেন্ট করুন না কেন, তার অ্যাকাউন্ট থেকে শুধুমাত্র পণ্যের মূল দামটিই কাটবে, কোনো অতিরিক্ত ফি বা ক্যাশ-আউট চার্জ দিতে হবে না। এই ফি সম্পূর্ণভাবে মার্চেন্ট বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বহন করবে।
৮. “সবার আগে বাংলাদেশ” দর্শনে কর ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এই পলিসির পেছনে সুদূরপ্রসারী সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে:
SME কর সুরক্ষা: এনআইডি দিয়ে কিউআর কোড বা ব্যক্তিগত মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট নেওয়ার সুযোগ থাকায় ছোট উদ্যোক্তারা যাতে শুরুতেই করের জালে পিষ্ট না হন, সেজন্য সরকার বার্ষিক ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার ভ্যাট মুক্ত রাখার সুবিধা কঠোরভাবে বজায় রেখেছে।
পরিচালনা খরচ হ্রাস: কাগজের টাকা প্রিন্ট করা ও কুরিয়ারের মাধ্যমে ক্যাশ অন ডেলিভারির (COD) টাকা সংগ্রহ করার লজিস্টিক ও ঝুঁকি খরচ (যা মোট লেনদেনের প্রায় ১.৫% থেকে ২% হয়ে থাকে), বাংলা কিউআর পেমেন্টের মাধ্যমে তা প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। এতে দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ও পরিচালনা ব্যয় কমবে, যার সুফল সরাসরি ক্রেতারা পাবেন।
সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, বর্তমান সরকারের এই নীতিমালার উদ্দেশ্য কোনো জটিল লুপ তৈরি করে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা নয়, বরং দেশীয় ক্ষুদ্র ও ই-কমার্স খাতকে শক্তিশালী করা এবং একটি সাশ্রয়ী ও বিশ্বমানের পেমেন্ট আর্কিটেকচার গড়ে তোলা। এই সঠিক তথ্যটি জানা থাকলে দেশের উদ্যোক্তারা কোনো ধরণের আইনি ভীতি ছাড়াই তাদের ব্যবসা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করতে পারবেন।


