টেকসিঁড়ি রিপোর্ট: চলছে ইন্টারনেট সোসাইটি (ISOC) বাংলাদেশ ঢাকা চ্যাপ্টারের ২০২৬ সালের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সদস্যদের জন্য অনলাইন ভোটগ্রহণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং আগামী ১৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
সম্প্রতি ইন্টারনেট সোসাইটি বাংলাদেশ ঢাকা চ্যাপ্টারের বর্তমান সভাপতি ড. মোহাম্মদ নাদির বিন আলি-র সঙ্গে কথা বলেছেন টেকসিঁড়ি ডটকমের প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক সামিউল হক সুমন। আলোচনায় উঠে এসেছে সংগঠনের পথচলা, বর্তমান কার্যক্রম, নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
টেকসিঁড়ি: সামনে নির্বাচন। আপনি বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি এবং শুরু থেকেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আপনার যাত্রার শুরুটা যদি আমাদের জানান।
ড. মোহাম্মদ নাদির বিন আলি: সত্যি বলতে, শুরুতে খুব বেশি না বুঝেই সদস্য হয়েছিলাম। পরিচিতজনেরা সদস্য হতে বলেছিলেন, তাই সদস্য হই। যতদূর মনে পড়ে, ইন্টারনেট সোসাইটি (ISOC) ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ইন্টারনেটের অন্যতম পথিকৃৎ ভিন্ট সার্ফ (Vint Cerf)। যদিও সংস্থাটির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে, প্রথম চ্যাপ্টার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে জাপানে। বাংলাদেশে ঢাকা চ্যাপ্টার প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালে। সেই সময় ভিন্ট সার্ফ ঢাকায় এসেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে আমার একটি স্মরণীয় ছবি তোলার সুযোগ হয়েছিল।
বাংলাদেশে এই চ্যাপ্টার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে অনেকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে সুমন আহমেদ সাবির, জাহাঙ্গীর হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ-এর অবদান উল্লেখযোগ্য। ড. সাব্বির আহমেদ সভাপতি থাকাকালে আমাকে নির্বাচন করতে উৎসাহ দেন। এরপর আমি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করি এবং সেখান থেকেই সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যাই।
দুই বছরের মেয়াদে অনেক কিছু করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সময় খুব দ্রুত চলে যায়। আমরা যারা কর্পোরেট বা প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করি, তাদের জন্য ২৪/৭ ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করা সহজ নয়।
ইন্টারনেট সোসাইটির মূল লক্ষ্য হলো নিরাপদ, উন্মুক্ত ও সবার জন্য সহজলভ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করা। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগে সংগঠনটি কাজ করে। একই সঙ্গে IETF (Internet Engineering Task Force)-এর কার্যক্রমেও সহায়তা প্রদান করে। বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সক্রিয় সদস্যের অভাব। একসময় সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫০–৩০০। এখন সদস্য প্রায় ২,০০০ হলেও কোনো কর্মসূচিতে ১৫০ জন সক্রিয় সদস্যও অনেক সময় পাওয়া যায় না। এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; বিশ্বের অনেক দেশেই একই চিত্র। মালয়েশিয়ায় একটি কর্মসূচিতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি। আমার বিশ্বাস, আগামী নেতৃত্বের অন্যতম দায়িত্ব হবে প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কার্যক্রম এবং সদস্যদের আরও সক্রিয় করে তোলা। শুধু নির্বাচন নয়, পুরো দুই বছর জুড়েই কাজ করতে হবে। আমরা যদি সক্রিয় মানুষ তৈরি করতে না পারি, সেটি আমাদের সবার ব্যর্থতা।
বাংলাদেশ চ্যাপ্টার ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের অবস্থান বেশ ভালো। বর্তমানে আমরা ‘এ’ গ্রেডের চ্যাপ্টার হিসেবে স্বীকৃত। এই অবস্থান ধরে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিতে আমাদের আরও সক্রিয় সদস্য প্রয়োজন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশে ইন্টারনেট সোসাইটির চ্যাপ্টার রয়েছে, এবং বাংলাদেশকে একটি কর্মক্ষম ও সক্রিয় চ্যাপ্টার হিসেবে সবাই চেনে।
টেকসিঁড়ি:মূল আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে আমাদের সমন্বয় ও সহযোগিতা কেমন?
ড. নাদির: আমরা আন্তর্জাতিক মূল সংগঠন থেকে নিয়মিত দিকনির্দেশনা পাই। তারা বিভিন্ন বৈশ্বিক কর্মসূচির বিষয়ে আমাদের অবহিত করে এবং আমরা সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। একইভাবে আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কেও তাদের জানানো হয়। কীভাবে আরও কার্যকরভাবে কাজ করা যায়, সে বিষয়ে তারাও আমাদের পরামর্শ দিয়ে থাকে।
টেকসিঁড়ি:এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক বেশি। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. নাদির:আমি এটিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছি। যত বেশি মানুষ নির্বাচন করবেন, তত বেশি মানুষ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন। ধরুন, ১০ জন প্রার্থী হলে হয়তো একজন নির্বাচিত হবেন, কিন্তু তাদের মধ্যে আরও কয়েকজন ভবিষ্যতে সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন। এটি অবশ্যই একটি ভালো লক্ষণ। এবার নির্বাচনের আগে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সদস্য ফোন করে মতামত জানতে চেয়েছেন। আমি সবাইকে একটাই কথা বলেছি, প্রার্থীদের প্রোফাইল দেখুন, তাদের কাজ দেখুন এবং যাকে যোগ্য মনে হয় তাকেই ভোট দিন। গতবার এমন আগ্রহ দেখিনি। এবার সদস্যদের এই সম্পৃক্ততা আমাকে আশাবাদী করেছে।
টেকসিঁড়ি: নির্বাচন প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হয়?
ড. নাদির:প্রতি দুই বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন শুরুর কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। সাধারণত একজন বাংলাদেশ থেকে এবং দুজন বিদেশ থেকে মোট তিনজন কমিশনার এই দায়িত্ব পালন করেন। পুরো ভোটিং সিস্টেম আন্তর্জাতিকভাবেই পরিচালিত হয়। নতুন কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব পালন করে।
টেকসিঁড়ি:এবার নির্বাচিত হলে আপনার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে?
ড. নাদির: একজন ব্যক্তি একই পদে দুইবারের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তাই এবারই আমার শেষ সুযোগ। নির্বাচিত হলে অবশ্যই কাজ করব, আর নির্বাচিত না হলেও নতুন নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। আমার প্রধান পরিকল্পনা হলো সদস্যদের আরও সক্রিয় করা। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট ছোট ISOC কমিউনিটি বা চ্যাপ্টার গড়ে তুলতে চাই। যদি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকশ সদস্যও যুক্ত হয়, তাহলে সংগঠনের সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার গাইডলাইন, প্রযুক্তি বিষয়ক কর্মশালা এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে চাই। নির্বাচিত হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই আগামী দুই বছরের একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করব। আর যদি নির্বাচিত না হই, তবুও সংগঠনের উন্নয়নে কাজ করে যাব। কারণ এটি আমার পেশা নয়; এটি আমার ভালোবাসার একটি জায়গা।
টেকসিঁড়ি:ভোটারদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো বার্তা?
ড. নাদির:আমি সকল সদস্যকে অনুরোধ করব নিরপেক্ষভাবে ভোট দিন। এখানে ব্যক্তিগত প্রচারণা বা প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই।
যিনি আপনাদের কাছে যোগ্য, কর্মক্ষম, সহজে যোগাযোগযোগ্য এবং সময় দিতে পারবেন বলে মনে হয়, তাকেই ভোট দিন। আমি চাই আগামী দুই বছরের জন্য একটি প্রাণবন্ত ও কার্যকর কমিটি গঠিত হোক।
আমার প্রতিদ্বন্দ্বীও অত্যন্ত যোগ্য একজন ব্যক্তি। কেউ যদি তাঁকে যোগ্য মনে করেন, তাঁকেই ভোট দিন। আবার কেউ যদি আমাকে উপযুক্ত মনে করেন, আমাকে ভোট দিন। তবে সিদ্ধান্ত হোক প্রার্থীর কাজ, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করে।
আমাদের লক্ষ্য একটাই, ইন্টারনেট সোসাইটি বাংলাদেশ ঢাকা চ্যাপ্টার যেন আগামী দিনে আরও শক্তিশালী, সক্রিয় ও কার্যকর সংগঠন হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে।
টেকসিঁড়ি:আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
ড. নাদির: আপনাকেও আন্তরিক ধন্যবাদ।



