সোহেল মৃধা :মেধাবী তরুণদের উৎসাহ দিতে এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় আইসিটি বাজেট ব্যবহারের কিছু বাস্তবমুখী প্রস্তাবনা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের ই-কমার্স ইকোসিস্টেমে সরকারি তহবিল বণ্টন সংক্রান্ত একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
আইসিটি বিভাগ ও স্টার্টআপ বাংলাদেশের তহবিল থেকে একটি সাধারণ ফেসবুক পেজ-ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী বুটিক বা ফ্যাশন হাউসকে বড় অঙ্কের অনুদান দেওয়ার ঘটনাটি দেশের তরুণ আইটি উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের মাঝে বেশ কৌতুহল এবং যৌক্তিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একজন সাধারণ নাগরিক বা নীতি গবেষক হিসেবে এই আলোচনাকে আমাদের কেবল নেতিবাচক সমালোচনা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং একে আমাদের দেশের এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইকোসিস্টেমের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের নীতিগত সংস্কারের অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। এই ঘটনাটি মূলত একটি প্রকৃত প্রযুক্তিগত এবং দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য “স্টার্টআপ” এবং একটি প্রশংসনীয় ও ঐতিহ্যবাহী “ক্ষুদ্র ব্যবসা (SME)”-এর মধ্যকার তফাত ও সংজ্ঞাকে নীতিনির্ধারণী স্তরে আরও স্পষ্ট ও নিখুঁত করার জোর দাবি রাখে।
১। স্টার্টআপ বনাম সাধারণ ব্যবসা: ফারাকটা আসলে কোথায়?
আমাদের বর্তমান সরকার সবসময়ই দেশের ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে এবং তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। এই দারুণ সদ্বিচ্ছাকে শতভাগ সফল ও প্রশ্নাতীত করতে হলে আমাদের “স্টার্টআপ” এবং “ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র উদ্যোগ”-এর মধ্যকার সীমারেখাটুকু খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী জামদানি বা দেশীয় হস্তশিল্পকে টিকিয়ে রাখার যে আন্তরিক চেষ্টা, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য একটি বড় শক্তি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এই ধরনের উদ্যোগগুলো মূলত ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME), যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার সাধারণত কেবল ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করা, যোগাযোগ করা কিংবা কাস্টমারের অর্ডার নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
অন্যদিকে, একটি প্রকৃত স্টার্টআপের মূল চালিকাশক্তি ও ভিত্তিই হলো ‘প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন’ এবং অত্যন্ত দ্রুত ও বড় আকারে ব্যবসা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জ্যামিতিক ক্ষমতা (Scalability)। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো তরুণ উদ্যোক্তা এমন কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম বা বিশেষায়িত ফিনটেক সলিউশন তৈরি করেন যা দেশের হাজার হাজার প্রান্তিক তাঁতি ও কারিগরকে সরাসরি মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া বৈশ্বিক ক্রেতাদের সাথে যুক্ত করতে পারে এবং খুব দ্রুত বড় পরিসরে ব্যবসা বাড়াতে পারে, তবে সেটি একটি প্রকৃত স্টার্টআপ। প্রথমটির মূল আকর্ষণ হলো পণ্যের নিজস্ব গুণ ও শৈলী, আর দ্বিতীয়টির মূল প্রাণ হলো সম্পূর্ণ নতুন ও প্রযুক্তিগত সমাধান।
বাস্তবতা হলো, ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের (SME) আসল প্রয়োজন হলো সস্তা ও সহজলভ্য কাঁচামাল, তাঁতিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বিসিক বা এসএমই ফাউন্ডেশনের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা। আইসিটি বিভাগের কারিগরি অনুদান আসলে তাদের মূল ব্যবসায়িক মডেলে বা পণ্য উৎপাদনে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আনে না। তাই এই দুই ধরনের ভিন্নধর্মী উদ্যোগের জন্য সরকারি সহায়তার উইন্ডো বা খাতগুলোও সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া প্রয়োজন।
২। যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া যেভাবে আরও নিখুঁত হতে পারত
সরকার যখন দেশের মেধাবীদের সহায়তায় জনগণের করের টাকা বরাদ্দ করে, তখন সেই মহতী ও জনবান্ধব উদ্যোগের মূল চেতনাকে টিকিয়ে রাখতে এর সম্পূর্ণ বণ্টন প্রক্রিয়াটি সবার কাছে স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত হওয়া বাঞ্ছনীয়। যখন একটি সাধারণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ের ফেসবুক পেজ-ভিত্তিক বুটিক উদ্যোগকে আইসিটি বিভাগের বিশেষায়িত তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া হয়, তখন দিনরাত পরিশ্রম করা মাঠপর্যায়ের তরুণ আইটি উদ্যোক্তাদের মনে কিছু যৌক্তিক ও গঠনমূলক প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক:
ডেটা-ভিত্তিক নিখুঁত মূল্যায়ন: অনুদান দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত ট্রাফিক, মাসিক ইউনিক ইউজার, তাদের কারিগরি সক্ষমতা এবং তারা দেশের অর্থনীতি বা কর্মসংস্থানে কতটা গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারছে—তা কি কোনো বৈজ্ঞানিক ও পরিমাপযোগ্য উপায়ে যাচাই করা হয়েছিল?
স্বার্থের সংঘাত ও স্বজনপ্রীতি এড়ানো: রাষ্ট্রীয় তহবিল বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বাধীন একটি জুরি বোর্ডের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবে তা সরকারের সততা এবং স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত নীতিকেই সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও উজ্জ্বল করে তোলে।
সঠিক বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা: আইসিটি বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষায়িত বাজেট যদি অ-প্রযুক্তিগত প্রথাগত বুটিক উদ্যোগে ব্যবহৃত হয়, তবে তা মূল আইটি সেক্টরের গবেষণা, উন্নয়ন ও নতুন উদ্ভাবনের সুযোগকে চরমভাবে সংকুচিত করে ফেলে। হস্তশিল্প বা ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দেখভালের জন্য সরকারের বিসিক (BSCIC) বা তাঁত বোর্ডের মতো অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
৩। আমাদের তরুণ উদ্যোক্তাদের মনে এর কী প্রভাব পড়ছে?
আমাদের আইটি ইকোসিস্টেম ও স্টার্টআপ কালচারের একটি চমৎকার ভিত্তি গড়ে তোলায় সরকার বিগত বছরগুলোতে অসাধারণ কিছু কাজ করেছে। কিন্তু এই মহৎ অর্জনের গতি যাতে সামান্য তদারকিগত সমন্বয়হীনতার কারণে ম্লান না হয়ে যায়, সে বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে:
তরুণদের আস্থা রক্ষা ও মেধাপাচার রোধ: দেশের মেধাবী তরুণরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে বা গ্যারেজে বসে দিনরাত এক করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন কিংবা বড় কোনো লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম বানায়, তারা মূলত দেশের টেকসই ভবিষ্যতের সহযাত্রী হিসেবে কাজ করে। এই তরুণরা যখন দেখে কোনো রকম কারিগরি বা প্রযুক্তিগত ভিত্তি ছাড়াই লবিং বা প্রভাবের জোরে একটি অতি সাধারণ বুটিক উদ্যোগ আইসিটি খাতের বরাদ্দ পেয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়, যা অনেক সময় তাদেরকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার (Brain Drain) মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের অনীহা: বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিগুলো যখন দেখে একটি দেশের সরকারি অনুদান ও সহায়তার পুরো প্রক্রিয়াটি শতভাগ মেধা, স্বচ্ছতা ও ডেটা-ভিত্তিক উপায়ে পরিচালিত হচ্ছে, তখন তারা এই দেশের সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ওপর গভীর আস্থা পায়। এর ফলে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগের দুয়ার যেমন খুলে যায়, তেমনি অসঙ্গতিপূর্ণ বণ্টন প্রক্রিয়া দেখলে তারা বিনিয়োগ গুটিয়ে নিতেও দ্বিধা করে না।
৪। যেভাবে এই অনুদান প্রক্রিয়াকে আরও সুন্দর ও আদর্শ করা যায়
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকার যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের আদর্শ নীতি নিয়ে কাজ করছে, এই প্রক্রিয়াগুলোকে আরও বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ করার মাধ্যমে সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যটি আরও সহজে ও দ্রুত অর্জন করা সম্ভব। এজন্য কয়েকটি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
ওপেন ডেটা বা উন্মুক্ত তথ্যের নীতি: রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের মূল যৌক্তিকতা, জুরি বোর্ডের মূল্যায়ন স্কোর এবং তাদের কাজের সামগ্রিক অগ্রগতি একটি নির্দিষ্ট অনলাইন ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখা যেতে পারে। এটি সরকারের স্বচ্ছতার ভাবমূর্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
নিরপেক্ষ কারিগরি কমিটি গঠন: যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিবিদ, সফল আইটি উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ ও নিরপেক্ষ আইটি ফোরামের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অনুদান প্রদানের চূড়ান্ত জুরি বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন।
খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট বাজেট ও সীমানা নির্ধারণ: আইসিটি বিভাগের বিশেষায়িত বাজেটকে কঠোরভাবে কেবল উচ্চ-প্রযুক্তি (Deep-Tech), সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং মৌলিক প্রযুক্তিগত নতুন উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। অন্যদিকে, দেশীয় বুটিক বা তাঁত শিল্পের প্রসারে টেক্সটাইল বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উইন্ডোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
উদ্যোক্তা-বান্ধব এবং মেধাবী বাংলাদেশ গড়ার যে আদর্শিক নীতি নিয়ে আমাদের সরকার কাজ করছে, সাধারণ নাগরিক ও গবেষক হিসেবে আমরাও প্রতিটি সরকারি কর্মকাণ্ডে তারই সুন্দর প্রতিফলন দেখতে চাই। সরকারি অনুদান বিতরণের এই প্রক্রিয়াটিকে আরও নিখুঁত, নিরপেক্ষ ও ডেটা-চালিত করার মাধ্যমেই আমরা একটি প্রকৃত মেধাভিত্তিক ‘স্মার্ট ইকোনমি’ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।



