টেকসিঁড়ি রিপোর্ট: সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত ব্যাপক সাইবার আক্রমণের মুখে পড়েছে জাপানের শীর্ষস্থানীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান। এআই-এর সহায়তায় ছড়িয়ে পড়া বিধ্বংসী র্যানসমওয়্যার হামলার প্রেক্ষিতে দেশটির সরকার এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাইবারস্পেসে জরুরি অবস্থা’ (State of Emergency in Cyberspace) ঘোষণা করেছে।
এই সংকট কাটাতে সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে টোকিও।
চাকরির বাজার ও পরিবেশের ওপর এআই প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক থাকলেও, চলতি বছর সাইবার নিরাপত্তাই প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানের মতো শীর্ষ ব্যক্তিরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, যেকোনো সময় বিশ্ব কাঁপানো বড় সাইবার আক্রমণ ঘটতে পারে। এমনকি এআই টুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে হ্যাকিং চালানোর নজিরও দেখা গেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব আক্রমণ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; জাপানের শীর্ষস্থানীয় ২০টিরও বেশি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সাইবার হামলার শিকার হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হয়েছে।
আক্রমণের শিকার জাপানি ব্র্যান্ড ও জরুরি পরিষেবা
জাপানভিত্তিক অন্তত ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান এই এআই-চালিত সাইবার হামলার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে সুপরিচিত গাড়ি ভাড়াদাতা প্রতিষ্ঠান ‘টাইমস কার’ (Times Car) এবং কনভেনিয়েন্স স্টোর চেইন ‘লসন’ (Lawson)-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো অন্তর্ভুক্ত।
কেবল করপোরেট প্রতিষ্ঠানই নয়, গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল এবং সরকারি অবকাঠামোতেও হানা দিয়েছে সাইবার অপরাধীরা। ফলে কোটি কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত ও অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ‘টাইমস কার’-এর তথ্য ফাঁসের ঘটনায় জাপানি নাগরিকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ছবি ডার্ক ওয়েবের কালোবাজারে মাত্র ২৫ ইয়েন (প্রায় ০.১৫ মার্কিন ডলার)-এ বিক্রি হতে দেখেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের পুরোনো ধাঁচের সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তি সচেতনতার সীমাবদ্ধতা এই সাইবার ঝুঁকিতে পড়ার অন্যতম বড় কারণ। যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন সতর্ক করে আসলেও পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়ায় এখন চরম মূল্য দিতে হচ্ছে জাপানি কোম্পানিগুলোকে।
সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া
সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতায় সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছে জাপান সরকার। দেশটির ন্যাশনাল সাইবারসিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি হেডকোয়ার্টার্স (NCSH)-এর প্রধান মাসাকি তাইরা সাইবারস্পেসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত সংকটজনক’ আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাপানের সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী তোশিহারু ফুরুকাওয়া।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে :
নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ড্রাইভিং লাইসেন্সকে একমাত্র পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ না করার জন্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকদের সুরক্ষায় চিপযুক্ত পরিচয়পত্র, যেমন পাসপোর্ট বা জাপানের জাতীয় পরিচয়পত্র ‘মাই নম্বর’ কার্ড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হ্যাকারদের ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার যেভাবে দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে, তাতে সামনে আরও বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে। তাই প্রচলিত সুরক্ষাবলয় ভেঙে অবিলম্বে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সাইবার প্রতিরক্ষা গড়ে তোলাই এখন একমাত্র সমাধান।


