সোহেল মৃধা : একটি রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, তার মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের রাজস্ব নীতি। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাষ্ট্রের কর ব্যবস্থা হওয়া উচিত প্রগতিশীল। অর্থাৎ, যার আয় ও সম্পদ যত বেশি, সে তত বেশি কর দেবে; আর সেই টাকায় সামাজিক সুরক্ষা পাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।
কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র উল্টো। একপাশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোর গল্প, অন্যপাশে রাজস্ব আদায়ের মূল ভরসা পরোক্ষ কর বা ভ্যাট (VAT)। এই পরোক্ষ কর আয় বৈষম্য বিবেচনা না করে রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক, কৃষক ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের ওপর এক অন্যায্য বোঝা হয়ে চেপে বসেছে। ঝুমবৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া এক রিকশাচালকের আক্ষেপই এই ব্যবস্থার আসল সত্য উন্মোচন করে। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, সারাদিন কষ্ট করে রিকশা চালিয়ে যা পান, সেই টাকায় পরিবার নিয়ে একটু শান্তিতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা যায় না কেন?
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও যে মানুষ খাবারের নিশ্চয়তা পায় না, এক কেজি আটা বা বিস্কুট কিনতে তাকেও কোটিপতির সমান ভ্যাট দিতে হয়। অসম আয়ের দেশে পণ্যে সমান কর বসানোর এই নীতিগত অন্যায় এবং ধনীদের আয়কর ফাঁকির পরিণতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সময় এসেছে।
সবার জন্য সমান ভ্যাট কেন চরম অন্যায়?
কর মূলত দুই ধরনের। প্রথমটি প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর, যা আয়ের ওপর সরাসরি ধার্য হয়। অন্যটি পরোক্ষ কর বা ভ্যাট, যা বাজারে পণ্য বা সেবা কেনার সময় ক্রেতাকে মেটাতে হয়। একটি সাবান বা আটার প্যাকেটে সবার জন্য সমান ভ্যাট থাকা বাহ্যিকভাবে সমান নিয়ম মনে হলেও অর্থনৈতিক বিচারে তা চরম অন্যায্য। একে বলা হয় पश्चাৎমুখী কর ব্যবস্থা বা Regressive Tax System।
এর মূল কারণ আয়ের গাণিতিক তফাত। বাজারে আটা কিনতে গিয়ে ৫ টাকা ভ্যাট দিলে, মাসে ১০ লাখ টাকা আয় করা কোটিপতির জন্য তা আয়ের মাত্র ০.০০০৫ শতাংশ। কিন্তু দৈনিক ৫০০ টাকা আয় করা রিকশাচালকের জন্য এই ৫ টাকা তাঁর আয়ের সরাসরি ১ শতাংশ। উপরন্তু, নিম্নআয়ের মানুষকে তাঁর উপার্জনের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ টাকাই খাদ্য, ওষুধ ও প্রাত্যহিক খরচে ব্যয় করে ফেলতে হয়। ফলে তাঁর আয়ের প্রায় পুরোটাই ভ্যাটের আওতায় চলে আসে। অন্যদিকে ধনিক শ্রেণী আয়ের বড় অংশ ব্যাংকে সঞ্চয় করেন বা নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, যা নিত্যপণ্যের ভ্যাটের আওতার বাইরে থেকে যায়।
দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের বাস্তব জীবন
এই অন্যায্য বৈষম্যের শিকার সমাজের প্রতিটি মেহনতী মানুষ। কাকভেজা হয়ে সারাদিন রিকশার প্যাডেল ঘোরালেও দিনশেষে টিকে থাকার দুশ্চিন্তা মেটে না রিকশাচালক কিংবা দিনমজুরের। অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে ফ্রি ওষুধ বা বেড মেলে না, অথচ তাঁদের কেনা পণ্যের ভ্যাট নিয়মিত সরকারি কোষাগারে জমা হয়। একইভাবে, গার্মেন্টস শ্রমিকেরা মাসজুড়ে কায়িক শ্রম দিয়ে পাওয়া ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা মজুরির বড় অংশ চাল, ডাল, তেল, সাবান বা স্যানিটারি প্যাড কিনতে ভ্যাট হিসেবে দিয়ে দেন, অথচ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে তাঁরা চিরকাল বঞ্চিত থাকেন।
একই করুণ অবস্থা প্রান্তিক কৃষকের। জমিতে সেচের ডিজেল, সার বা কীটনাশক কেনার সময় শুল্ক ও ভ্যাট দিলেও বাজারে ফসল বিক্রিতে ন্যায্য দাম পান না তাঁরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলেও রাষ্ট্র থেকে বিনামূল্যে সার-বীজ পাওয়ার নিশ্চয়তা মেলে না। এমনকি নির্দিষ্ট আয়ের শিক্ষক ও চাকরিজীবীরাও এই চাপের বাইরে নন। ব্যাংকে বেতন আসার আগেই তাঁদের থেকে উৎসে আয়কর (TDS) কেটে নেওয়া হয়। এর ওপর বাজার খরচ, বিদ্যুৎ বিল ও মোবাইল রিচার্জে পদে পদে ভ্যাট গুনে তাঁরা নিঃস্ব হন। তাঁরা প্রত্যক্ষ কর ফাঁকি দিতে পারেন না, আবার ভ্যাট দিয়েও মানসম্মত কোনো সেবা পান না। অন্যদিকে তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দোকান বরাদ্দ, ট্রেড লাইসেন্স ও কাঁচামালের ভ্যাট দিয়ে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খান, যেখানে বড় বড় শিল্পপতিরা প্রশাসনিক দাপটে বছরের পর বছর বিশেষ কর অবকাশ পান।
কর ফাঁকি দেন ধনীরা, চাপ পড়ে আমজনতার ওপর
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রশাসনিক উপাত্ত পর্যালোচনা করলে রাজস্ব কাঠামোর এই সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বৈশ্বিক মানদণ্ডে একটি রাষ্ট্রের মোট রাজস্বের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আসা উচিত ধনীদের প্রত্যক্ষ আয়কর থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে মোট রাজস্বের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর, অর্থাৎ ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক থেকে। বিপরীতে রাজস্বে প্রত্যক্ষ করের অবদান মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। ১৭ কোটি মানুষের দেশে টিআইএনধারী প্রায় ১ কোটি হলেও প্রকৃতপক্ষে আয়কর বিবরণী জমা দেন মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম। ফলে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭.৫ থেকে ৮ শতাংশে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন।
অন্যদের প্রতি এই অবিচার আরও গভীর হয় বাজেটে অসাধু উপায়ে অর্জিত কালো টাকা অল্প জরিমানায় বৈধ করার সুবিধায়। সাধারণ মানুষ কেনাকাটায় ভ্যাট দিচ্ছে, অথচ কর ফাঁকিবাজেরা ছাড় পাচ্ছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতিতে পণ্যের দাম বাড়লে নির্দিষ্ট শতাংশ হারের ভ্যাটের টাকার অঙ্কও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে, যা মানুষকে দ্বিগুণ চাপে ফেলে। আবার ক্যাশলেস কেনাকাটা, মোবাইল ওয়ালেট বা ইএফডি মেশিনে মানুষ ভ্যাট দিলেও তদারকির অভাবে অনেক ব্যবসায়ী তা সরকারি খাত থেকে আত্মসাৎ করে।
ডিজিটাল কমার্স খাতে ভোক্তা অধিকার ও নীতিগত উন্নয়ন নিয়ে গবেষণারত প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (CDCRA)-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে স্বচ্ছতা ও সঠিক ট্র্যাকিং না থাকায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পরোক্ষ কর রাজস্ব থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে, আর ভোক্তারা সেবা না পেয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ‘ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক’-এর মতে, কর ফাঁকি ও বিদেশে অর্থ পাচারে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব হারায়। আর পিপিআরসি ও বিভিন্ন সংস্থার মতে, চিকিৎসাব্যয় ও পরোক্ষ করের চাপে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ছে।
সাধারণ মানুষের করের টাকা আসলে যায় কোথায়?
এই অন্যায্য রাজস্ব ব্যবস্থার ফলে দেশে আয় বৈষম্য পরিমাপক ‘জিনি সহগ’ বেড়ে প্রায় ০.৫০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে, যার অর্থ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ জমা হচ্ছে গুটিকয়েক ধনীর পকেটে। উপরন্তু স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৬৮ শতাংশ খরচ সাধারণ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়।
সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো ভ্যাটের টাকা মূলত তিনটি জায়গায় চলে যায়। প্রথমত, সাধারণের ট্যাক্সের টাকায় প্রশাসনিক বিশাল বেতন-ভাতা মেটানো হয়, যার একটি অংশ দুর্নীতিবাজদের মাধ্যমে বিদেশে পাচার (Capital Flight) হয়। দ্বিতীয়ত, রাজস্বের বড় অংশ চলে যায় অসাধু ঠিকাদার ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের হাতে।
আর তৃতীয়ত, ভৌগোলিক বৈষম্যের কারণে বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয় ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী বা উত্তরার মতো অভিজাত এলাকার অবকাঠামো সাজাতে, যেখানে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার মেহনতী মানুষের ভাগ্যে জোটে সামান্যই। টেলিভিশনের টকশোতে বুদ্ধিজীবীরা এসি রুমে বসে দেশপ্রেমের বুলি আওড়ে দিনশেষে সম্মানী পকেটে তোলেন। কিন্তু যে মেহনতী মানুষের করের টাকায় এই রাষ্ট্র ও অর্থনীতি ঘোরে, তাঁদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার হিসাব কোথাও মেলে না।
বিশ্ব কীভাবে এই বৈষম্য সামলালো?
বিশ্বের অনেক দেশই এই অন্যায্য কর কাঠামো বদলে বৈষম্য কমাতে সফল হয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, যেমন—ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেনে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা কার্যকর। সেখানে ধনীদের আয়ের ওপর ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ কর বসিয়ে সেই টাকায় প্রতিটি নাগরিককে বিনামূল্যে বিশ্বমানের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়।
নিউজিল্যান্ড ও উরুগুয়ের মতো দেশ চাল, আটা, ডাল ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভ্যাটের হার কমিয়ে ০ শতাংশ করেছে, আর সেই রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে বিলাসবহুল পণ্য ও ধনীদের সম্পদের ওপর বাড়তি কর বসিয়েছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতও ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থায় (আধার ও প্যান কার্ড) সমন্বয় করে প্রত্যক্ষ করদাতার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করেছে এবং নিত্যপণ্যে ভ্যাট কমিয়ে বিলাসদ্রব্যে শুল্ক বাড়িয়েছে।
পরিস্থিতি বদলাতে যা করা জরুরি
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার এই সামাজিক অন্যায্যতা দূর করতে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি। প্রথমত, চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, ওষুধ ও শিশুখাদ্যের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে পরোক্ষ কর বা ভ্যাট সম্পূর্ণ তুলে নিতে হবে এবং এর বদলে বিলাসবহুল গাড়ি, এসি, রিসোর্ট ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ভ্যাটের হার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভ্যাট তোলার সহজ পথ থেকে সরে এসে ধনীদের ওপর প্রগতিশীল আয়কর জোরদার করতে হবে এবং ১০ কোটি টাকার ওপর সম্পদে কড়া সম্পদ কর (Wealth Tax) আরোপ করতে হবে।
তৃতীয়ত, কর আদায় প্রক্রিয়া শতভাগ অনলাইন ও ‘Faceless Assessment’-এর আওতায় আনতে হবে। সিডিসিআরএ (CDCRA)-এর পক্ষ থেকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে সুনির্দিষ্ট কর ছাড় ও স্বচ্ছতার যে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে, তা মেনে ইএফডি ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করে ব্যবসায়ীদের ভ্যাট আত্মসাৎ বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, কালো টাকা সাদা করার প্রথা চিরতরে বাতিল করে সৎ করদাতাদের পুরস্কৃত করতে হবে। এবং পঞ্চমত, জনগণের ভ্যাটের টাকায় সবার জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করতে হবে।
সমাধান কোথায়?
পণ্য কেনার সময় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ঢালাওভাবে একই ভ্যাট বসিয়ে রেখে “সবার জন্য সমান আইন” দাবি করাটা বাস্তবে এক ধরণের সামাজিক প্রতারণা। কারণ অসম উপার্জনের মানুষের ওপর সমান কর বসানো কখনোই সমতা হতে পারে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত রাষ্ট্র ধনীদের আয় ও সম্পদ থেকে বড় অঙ্কের প্রত্যক্ষ কর আদায় করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কল্যাণে তা ব্যয় করার নীতি গ্রহণ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই কাঁকভেজা রিকশাচালকের জীবনের চাকা ঘুরবে না—ঘুরবে কেবল ক্ষমতাবান বুর্জোয়া আর এলিটদের ভাগ্যের চাকা।
লেখক – উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষক


