টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, চট্টগ্রামের খুলশী কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে “বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০২৬ (চট্টগ্রাম)”। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ কন্ট্যাক্ট সেন্টার এন্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (বিপিসি), এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর-এর উদ্যোগে এ সামিটে অংশগ্রহণ করেন সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিল্পখাতের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীরা।
“Where Talent Meets Global Opportunity” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সামিটের পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে University Activation Program আয়োজন করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের বিপিও ও আইটিইএস শিল্প, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
পাশাপাশি “Round Table with Future Leaders” শীর্ষক রাউন্ডটেবিল আলোচনার মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্ব, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং যুবসমাজকে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত Policy Dialogue Session-এ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিপিও শিল্পের প্রতিনিধিগণ এবং চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। এ সেশনে বিপিও ও আইটিইএস শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা, চট্টগ্রামে এ খাতের সম্প্রসারণের সুযোগ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ এবং “বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০২৬ (চট্টগ্রাম)”–এর প্রত্যাশিত প্রভাব ও তাৎপর্য নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিকাশের লক্ষ্যে আয়োজিত তথ্যপ্রযুক্তি অলিম্পিয়াডে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। এ আয়োজনের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণদের উৎসাহিত করা হয়।
উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, এমপি, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের ফ্রিল্যান্সারদের “Freelancer Card Registration Program”-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, যা ফ্রিল্যান্সারদের আর্থিক ও পেশাগত কার্যক্রমকে আরও সহজতর এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
উদ্বোধন শেষে তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সঠিক দক্ষতা ও সুযোগের মাধ্যমে এই তরুণরাই ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে”। তিনি চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন (উপসচিব), অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর; বাক্কো কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি তানভীর ইব্রাহীম; এবং সাধারণ সম্পাদক ফয়সল আলিম। এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাক্কো কার্যনির্বাহী কমিটির সহ সভাপতি মোঃ তানজিরুল বাসার, অর্থ সম্পাদক মোঃ আমিনুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ মুসনাদ-ই-আহমদ, পরিচালক আবু দাউদ খান, পরিচালক আব্দুল কাদের এবং পরিচালক সায়মা শওকত।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আবদুল্লাহ আল মামুন তাঁর বক্তব্যে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সরকার, শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব এবং এ ধরনের আয়োজন সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে”।
বিপিও শিল্পের আর্থ-সামাজিক এবং আঞ্চলিক সম্ভাবনার উপর গুরুত্ব দিয়ে তানভীর ইব্রাহীম বলেন, “বাংলাদেশের বিপিও ও আইটিইএস শিল্প বর্তমানে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী খাত। শিল্পখাতটি বর্তমানে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে এবং ১ লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় এবং ৩ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বাক্কো কাজ করে যাচ্ছে”। তিনি আরও বলেন, “ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে সামিট আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় তরুণদের বৈশ্বিক সুযোগের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার ঘটানো”।
ফয়সল আলিম তাঁর বক্তব্যে বলেন, “দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নই বিপিও ও আইটিইএস শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি”। তিনি তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা এবং পেশাগত প্রস্তুতি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
সামিটের অন্যতম আকর্ষণ ছিল “Skilled Youth: Driving Innovation and Growth” শীর্ষক সেমিনার। সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সায়মা শওকত, পরিচালক, বাক্কো; রাশেদ মুজিব নোমান, কান্ট্রি ডিরেক্টর, অগমেডিক্স বাংলাদেশ; এমরাজিনা ইসলাম, প্রতিষ্ঠাতা, কাজ ৩৬০; মোঃ মুসনাদ-ই-আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাক্কো; রাহিতুল ইসলাম, লেখক ও সাংবাদিক, প্রথম আলো; শুভাশীষ ভৌমিক, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এটেক অস্ট্রেলিয়া ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড; মোঃ তাজদিন হাসান, চিফ বিজনেস অফিসার, দ্যা ডেইলি স্টার; এবং সাবের শাহ, প্রতিষ্ঠাতা, এডব্লিউ কমিউনিকেশন।
আলোচনায় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ফ্রিল্যান্সিং এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীরা শিল্পখাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা লাভের সুযোগ পান। বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তির ওপর।
সামিটের সফল আয়োজন বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। এ বছর “বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০২৬ (চট্টগ্রাম)”–এর প্লাটিনাম স্পন্সর হিসেবে যুক্ত ছিল Macinno Platforms Ltd, গোল্ড স্পন্সর হিসেবে Earth Next Technologies Ltd এবং সিলভার স্পন্সর হিসেবে TimoDesk ও Bangla B2B B2C.com।
দেশের বিপিও ও আইটিইএস শিল্পের উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির এ উদ্যোগে তাদের মূল্যবান অংশীদারিত্বের জন্য আয়োজকরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।


