মহিউদ্দিন আহমেদ :বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, ব্যাংকিং, কৃষি, যোগাযোগ ও নাগরিক সেবার অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। কিন্তু এই অবকাঠামো নিয়ে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গ্রাহক কি তার টাকার ন্যায্য সেবা পাচ্ছেন?
গত কয়েক বছরে মোবাইল ডাটার প্যাকেজের নামমাত্র মূল্য কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকলেও কার্যত প্রতি জিবির দাম বেড়েছে, ভ্যাট-ট্যাক্সের বোঝা কমেনি, আর নেটওয়ার্কের মান নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন হাজারো অভিযোগ দেখা যায়—“ডাটা আছে, গতি নেই”, “ভিডিও চলছে না”, “প্যাকেজ শেষ হয়ে যায় অস্বাভাবিক দ্রুত”, “গ্রামে 4G লেখা থাকলেও কাজ করে 2G-এর মতো”।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কি সত্যিই গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে? নাকি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে রাজস্ব আহরণই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? বিষয়টি বুঝতে হলে মূল্য, মান, করনীতি, প্রতিযোগিতা ও প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা—সবকিছু একসাথে দেখতে হবে।
দাম কমেছে—এই দাবির আড়ালে বাস্তবতা কী?
মোবাইল অপারেটররা প্রায়ই দাবি করে যে বাংলাদেশে প্রতি জিবি ডাটার দাম আগের তুলনায় কমেছে। সত্য যে কয়েক বছর আগে ১ জিবি ডাটা কিনতে তুলনামূলক বেশি টাকা লাগত। কিন্তু গ্রাহকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। কারণ এখন অধিকাংশ প্যাকেজে নির্দিষ্ট মেয়াদ, অ্যাপভিত্তিক সীমাবদ্ধতা, রাত-দিন আলাদা ব্যবহার এবং অটো-রিনিউয়ের মতো শর্ত যুক্ত হয়েছে। ফলে কাগজে প্রতি জিবির দাম কম দেখালেও কার্যকর ব্যবহারযোগ্য ডাটার মূল্য অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ৩০ দিনের একটি জনপ্রিয় প্যাকেজের মূল্য গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ যুক্ত হয়ে গ্রাহকের প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়িয়েছে। বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে মোট করের বোঝা প্রায় ৩৯ শতাংশের কাছাকাছি—যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ অপারেটর ১০০ টাকার সেবা বিক্রি করলে গ্রাহককে দিতে হয় প্রায় ১৩৯ টাকা পর্যন্ত। এই অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ রাষ্ট্রের রাজস্বে যায়, সেবার মান উন্নয়নে নয়।
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তুলনা:
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল ডাটার মূল্য এখনও তুলনামূলক কম দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। তবে মূল্য কম হওয়া আর সাশ্রয়ী হওয়া এক বিষয় নয়। মানুষের আয়, নেটওয়ার্কের মান এবং করের বোঝা বিবেচনায় চিত্র ভিন্ন।
দেশ প্রতি ১ জিবি (আনুমানিক)
বাংলাদেশ , $0.30–0.40 , কর বেশি, মান নিয়ে অভিযোগ
ভারত , $0.15–0.20, বিশ্বের অন্যতম সস্তা বাজার
পাকিস্তান, $0.20–0.30 , প্রতিযোগিতা তুলনামূলক বেশি
নেপাল, $0.45–0.60, ভৌগোলিক ব্যয় বেশি
শ্রীলঙ্কা , $0.25–0.35 , উচ্চ গতি, তুলনামূলক স্থিতিশীলতা
এই তুলনা দেখলে মনে হতে পারে বাংলাদেশে সমস্যা নেই। কিন্তু এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
প্রথমত, ভারতের গড় আয় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হলেও ডাটার দাম কম।
দ্বিতীয়ত, ভারতের বহু এলাকায় ৪জি নেটওয়ার্কের গড় গতি বাংলাদেশের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে একজন ভারতীয় গ্রাহক কম দামে বেশি মানের সেবা পান।
গতি ও মান: অভিযোগ কেন বাড়ছে?
বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটির কাছাকাছি। কিন্তু ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও নেটওয়ার্ক বিনিয়োগ সেই হারে বাড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে। শহরে সন্ধ্যার পর গতি কমে যাওয়া, গ্রামে দুর্বল কভারেজ, ইনডোর নেটওয়ার্ক সমস্যা এবং ভিডিও স্ট্রিমিংয়ে বাফারিং এখন সাধারণ অভিজ্ঞতা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গতি পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোবাইল ডাউনলোড গতি দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে নয়। অনেক সময় ভারত ও শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
– পর্যাপ্ত স্পেকট্রামের অভাব ও উচ্চ মূল্য।
– টাওয়ার স্থাপনে জটিল অনুমোদন ব্যবস্থা।
– ফাইবার ব্যাকহল সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতা।
– গ্রামীণ এলাকায় বিনিয়োগে অনীহা।
– নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অতিরিক্ত স্তর (আইআইজি, আইসিএক্স, এনটিটিএন ইত্যাদি) থেকে ব্যয় বৃদ্ধি।
ফলে গ্রাহক এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন যেখানে প্যাকেজ আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা নেই। বিশেষ করে অনলাইন ক্লাস, ভিডিও কনফারেন্স বা ডিজিটাল লেনদেনের সময় দুর্বল নেটওয়ার্ক সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করে।
নিয়ন্ত্রক কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন?
বিটিআরসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু বাস্তবে কমিশনের বিরুদ্ধে কয়েকটি বড় অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
মূল অভিযোগগুলো
- রাজস্বমুখী নীতি: লাইসেন্স ফি, স্পেকট্রাম মূল্য, নবায়ন ফি ও বিভিন্ন চার্জ বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়; গ্রাহক স্বার্থ তুলনামূলক কম গুরুত্ব পায়।
- মান নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা: নির্ধারিত QoS (Quality of Service) মানদণ্ড থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
- অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ধীরগতি: গ্রাহকের অভিযোগের দ্রুত ও বাধ্যতামূলক সমাধান ব্যবস্থা এখনও সীমিত।
- প্রতিযোগিতায় ভারসাম্যহীনতা: বড় অপারেটর ও ছোট সেবাদাতার মধ্যে নীতিগত বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
- স্বচ্ছতার অভাব: নেটওয়ার্ক মান, ড্রপ রেট, প্রকৃত গতি ও গ্রাহক অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ শুধু লাইসেন্স দেওয়া নয়; বরং গ্রাহকের অভিজ্ঞতা পরিমাপ করে অপারেটরকে জবাবদিহির আওতায় আনা। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে।
গ্রাহক অসন্তুষ্টির বাস্তব চিত্র:
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন ভোক্তা সংগঠন নিয়মিত যে অভিযোগগুলো পায়, তার মধ্যে রয়েছে:
- প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ডাটা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া।
- অপ্রত্যাশিত অটো-রিনিউ।
- নেটওয়ার্ক না থাকলেও ডাটা চার্জ কাটা।
- গ্রামে 4G দেখালেও ব্যবহার অযোগ্য গতি।
- কাস্টমার কেয়ারে দীর্ঘ অপেক্ষা।
- অভিযোগের লিখিত সমাধান না পাওয়া।
গ্রাহকের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার অভাব। কত গতি পাওয়ার কথা, বাস্তবে কত পাওয়া যাচ্ছে, কেন কম পাচ্ছে—এই তথ্য সাধারণ ব্যবহারকারীর নাগালে নেই।
ভারত থেকে কী শেখা যায়?
ভারতে গত এক দশকে টেলিযোগাযোগ খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা ডাটার দাম কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে স্পেকট্রাম নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টাওয়ার শেয়ারিং, ফাইবার সম্প্রসারণ এবং বৃহৎ বিনিয়োগ নেটওয়ার্ক মান উন্নত করেছে। যদিও ভারতের বাজারেও সমস্যা আছে, তবু গ্রাহক সাধারণত বেশি ডাটা, বেশি গতি এবং কম মূল্যের সমন্বয় পেয়ে থাকেন।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—কর কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো, অবকাঠামো ভাগাভাগি উৎসাহিত করা এবং গ্রাহক তথ্য উন্মুক্ত করা। শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে মান নিশ্চিত করা যায় না।
করের বোঝা কমানো জরুরি:
টেলিযোগাযোগ এখন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো মৌলিক অবকাঠামো। কিন্তু এই খাতে এখনও উচ্চ ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ বিদ্যমান। অর্থনীতিবিদদের মতে, ডাটার উপর অতিরিক্ত কর ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
যদি সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ বা ক্যাশলেস অর্থনীতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে মোবাইল ইন্টারনেটকে রাজস্বের উৎস নয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগের অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। কী করা দরকার?
বর্তমান সংকট থেকে বের হতে কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ জরুরি :
অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার
ডাটা প্যাকেজের সব শর্ত সহজ ভাষায় প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
মোবাইল ডাটার উপর কর ধাপে ধাপে কমানো।
বিটিআরসিকে গ্রাহক-কেন্দ্রিক স্বাধীন নিয়ন্ত্রক হিসেবে শক্তিশালী করা।
প্রতি জেলায় বাস্তব গতি ও নেটওয়ার্ক মানের রিপোর্ট প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা আইনগতভাবে নির্ধারণ করা।
টাওয়ার ও ফাইবার অবকাঠামো যৌথ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।
গ্রামীণ এলাকায় মানভিত্তিক বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক করা।
স্পেকট্রাম মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
শেষ কথা:
বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গল্প কেবল দাম বাড়া বা কমার গল্প নয়; এটি আস্থা, স্বচ্ছতা ও ন্যায্য সেবার গল্প। কাগজে-কলমে ডাটার মূল্য কম দেখানো সহজ, কিন্তু গ্রাহক যখন ভিডিও দেখতে পারেন না, অনলাইন ক্লাসে যুক্ত থাকতে পারেন না, মোবাইল ব্যাংকিং করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হন—তখন সেই সস্তা ডাটা অর্থহীন হয়ে যায়।
আজ প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। বিটিআরসিকে শুধু লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা নয়, গ্রাহকের অধিকার রক্ষাকারী আধুনিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সরকারকে টেলিযোগাযোগ খাতকে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। আর অপারেটরদের বুঝতে হবে—দীর্ঘমেয়াদে লাভের একমাত্র পথ হলো গ্রাহকের আস্থা অর্জন।
বাংলাদেশের মানুষ এখন আর শুধু “ডাটা” চায় না; তারা চায় নির্ভরযোগ্য, দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট। এই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন কাগজেই থেকে যাবে।
(লেখক: মহিউদ্দিন আহমেদ, সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন)


