টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : স্মার্টফোনের যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এর ফলে শাওমি, অপো এবং ভিভোর মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা স্মার্টফোন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো চলতি বছর তাদের স্মার্টফোন শিপমেন্টের (সরবরাহ) লক্ষ্যমাত্রা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চলতি মেমোরি সংকট বা চিপের অভাব একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে—যে ধারণা অনুযায়ী মনে করা হতো সময়ের সাথে সাথে ডিজিটাল গ্যাজেট বা প্রযুক্তির দাম কমবে।
সম্প্রতি অ্যাপল তাদের ম্যাকবুক ও আইপ্যাডের দাম বাড়ানোর পর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে যন্ত্রাংশের সংকট ও ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচের কারণে চীনা স্মার্টফোন কোম্পানিগুলো তীব্র চাপের মুখে পড়েছে।
শাওমি, অপো ও ভিভোর নতুন লক্ষ্যমাত্রা
‘নিক্কেই এশিয়া’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্যামসাং ও অ্যাপলের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন ব্র্যান্ড শাওমি (Xiaomi) বছরের শুরুতে তাদের সরবরাহকারীদের জন্য ১৩৫ মিলিয়ন (১৩.৫ কোটি) ইউনিটের একটি মাঝারি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ২০১৫ সালে যেখানে তারা ১৭০ মিলিয়ন (১৭ কোটি) ফোন বাজারে ছেড়েছিল, সেই তুলনায় এটি এমনিতেই কম ছিল।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে শাওমি সেই লক্ষ্যমাত্রা আরও ৩০ শতাংশ কমিয়ে প্রায় ৯৫ মিলিয়ন (৯.৫ কোটি) ইউনিটে নামিয়ে এনেছে। পরিস্থিতি উন্নত না হলে সরবরাহ আরও কমতে পারে বলেও কোম্পানিটি সতর্ক করেছে।
একইভাবে অপো এবং ভিভো তাদের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে প্রত্যেকে ৯০ মিলিয়ন (৯ কোটি) ইউনিটের নিচে নামিয়ে এনেছে। এছাড়া গত বছর রেকর্ড ৭১ মিলিয়ন (৭.১ কোটি) ফোন সরবরাহ করা অনার (Honor) কোম্পানিও তাদের সরবরাহকারীদের জানিয়েছে যে, ২০২৬ সালে তারা এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে পারবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রতিযোগিতা
এই সংকটের মূল কারণ হলো—স্মার্টফোন নির্মাতারা এখন একই ধরণের যন্ত্রাংশ, বিশেষ করে মেমোরি চিপের জন্য সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একসময় যেসব কম শক্তির ‘DRAM’ চিপ মূলত ফোনের জন্য তৈরি হতো, সেগুলো এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এআই সার্ভারগুলোতে। এনভিডিয়ার মতো এআই হার্ডওয়্যারে বিপুল পরিমাণ চিপের প্রয়োজন হওয়ায়, ফ্যাক্টরিগুলো চিপ উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন কোম্পানিগুলোর চেয়ে এআই খাতকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
সব ধরণের যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি
সমস্যাটি কেবল মেমোরি চিপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রসেসর, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (PCB) থেকে শুরু করে গ্লাস ক্লথ—সব ধরণের ইলেকট্রনিক উপাদানের দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ কমে গেছে।
এমনকি চিপ-প্যাকেজিংয়ের সুবিধাও এখন সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। মিডিয়াটেক (MediaTek) এবং কোয়ালকম (Qualcomm)-এর মতো বড় চিপ ডিজাইন কোম্পানিগুলো এখন বেশি লাভজনক ডেটা সেন্টার ব্যবসার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় মিডিয়াটেক তাদের প্রসেসরের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে।
বাজেট ও মিড-রেঞ্জ ফোনের ওপর প্রভাব
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শাওমি, অপো এবং ভিভোর মতো কোম্পানিগুলো, কারণ তাদের মূল ব্যবসাই দাঁড়িয়ে আছে বাজেট ও মিড-রেঞ্জ ফোনের ওপর। প্রিমিয়াম বা দামী ব্র্যান্ডগুলোর মতো তারা হুট করে ক্রেতাদের ওপর বর্ধিত মূল্যের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে না। তাই প্রতিটি ডিভাইসে লোকসান এড়াতে উৎপাদন বা সরবরাহ কমিয়ে দেওয়াকেই তারা প্রধান উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে।


