টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : অ্যাপলের হাত ধরে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পর, ভারতের স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারিং খাত এবার একটি নতুন ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সম্প্রতি চীনা স্মার্টফোন জায়ান্ট ভিভো এবং ভারতের শীর্ষস্থানীয় চুক্তিভিত্তিক ইলেকট্রনিক্স নির্মাতা ডিক্সন টেকনোলজিসের মধ্যে একটি নতুন যৌথ উদ্যোগের অনুমোদন দিয়েছে ভারত সরকার। এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা এই অংশীদারিত্বটি অবশেষে আলোর মুখ দেখছে।
৫১/৪৯ অনুপাতের নতুন চুক্তি
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম এই অংশীদারিত্বের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ২০২০ সালে ভারতের করা একটি বিশেষ নিয়মের কারণে এই বিনিয়োগ অনুমোদন পেতে দেরি হয়। ওই নিয়ম অনুযায়ী, ভারতের সাথে স্থল সীমানা রয়েছে এমন যেকোনো দেশের (যেমন চীন) বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরকারি যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হয়।
নতুন এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিত যৌথ উদ্যোগে সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতীয় কোম্পানির হাতে। ডিক্সন টেকনোলজিস এই যৌথ উদ্যোগের ৫১% শেয়ারের মালিক হবে এবং বাকি ৪৯% শেয়ার থাকবে ভিভোর কাছে।
ডিক্সন জানিয়েছে, এই নতুন কোম্পানিটি ভিভোর নির্দিষ্ট কিছু উৎপাদন সম্পদ অধিগ্রহণ করবে এবং ভারতে ভিভোর স্মার্টফোন অর্ডারের একটি বড় অংশ তৈরি করবে। পাশাপাশি এটি অন্য ব্র্যান্ডের জন্যও ইলেকট্রনিক্স পণ্য তৈরি করতে পারবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ বনাম রপ্তানি বৃদ্ধি
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের (Counterpoint Research) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের স্মার্টফোন রপ্তানির বাজারে বর্তমানে অ্যাপলের আধিপত্য এককভাবে সবচেয়ে বেশি—পুরো দেশের মোট স্মার্টফোন রপ্তানির ভলিউমের প্রায় ৫৭% অ্যাপলের দখলে।
বিপরীতে, চীনা ব্র্যান্ডগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ৭২% নিয়ন্ত্রণ করলেও, রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের অবদান ১০%-এরও কম। এর মধ্যে ভিভো ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে (Q1) ২৩% শিপমেন্ট শেয়ার নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই যৌথ উদ্যোগের ফলে চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য ভারত থেকে বড় আকারে বিশ্ববাজারে রপ্তানি করার একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে।
কেন স্থানীয় অংশীদারিত্ব জরুরি হয়ে উঠল?
২০২০ সালে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘাতের পর থেকে ভারত সরকার চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর কর ফাঁকি এবং অন্যান্য আইনি তদন্ত জোরদার করে। অপো, ভিভো এবং শাওমির মতো ব্র্যান্ডগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে বেশ কিছু আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় কোনো কোম্পানির কাছে মেজরিটি কন্ট্রোল বা প্রধান নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়াটাই চীনা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ভারতে টিকে থাকার এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে টেকসই মাধ্যম হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের ডিরেক্টর তরুণ পাঠক জানান, এই চুক্তিটি উভয় পক্ষের জন্যই একটি উইন-উইন (win-win) পরিস্থিতি তৈরি করবে। এটি ভিভোকে সরকারি নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসা চালাতে সাহায্য করবে এবং ডিক্সনকে বড় পরিসরে রপ্তানি বাজারে পা রাখার সুযোগ দেবে।
ডিক্সনের বিশাল প্রবৃদ্ধি
ভারতের বৃহত্তম ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং সেবাসংস্থা ডিক্সনের জন্য এই চুক্তিটি একটি বিশাল মাইলফলক। ডিক্সনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অতুল লাল জানিয়েছেন, ভিভোর বর্তমান বিক্রির ওপর ভিত্তি করে এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ডিক্সন বছরে প্রায় ২ কোটি থেকে ২.২ কোটি (২০-২২ মিলিয়ন) অতিরিক্ত স্মার্টফোন উৎপাদন করতে পারবে, যা তাদের ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, চীনা পুঁজি এবং স্থানীয় উৎপাদনের মধ্যকার এই ভারসাম্যপূর্ণ মডেলটি আগামীতে অন্যান্য চীনা স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও একটি আদর্শ বা ‘টেমপ্লেট’ হয়ে উঠতে পারে।


