টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : মোবাইল ব্যালেন্স লোনের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহক অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মোবাইল অপারেটরগুলো গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যালেন্স লোন দেওয়ার সুবিধা দিচ্ছে। এ জন্য ১০ টাকা সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে এই সুবিধা জরুরি মুহূর্তে গ্রাহকদের সহায়ক মনে হলেও, ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের প্রক্রিয়ায় পৃথকভাবে ভ্যাট ও অন্যান্য প্রযোজ্য কর আরোপের ফলে গ্রাহককে একই লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক পর্যায়ে করের বোঝা বহন করতে হতে পারে। বর্তমানে বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় ১০০ টাকায় ৫৮ টাকা কর আদায় করা হয় মোবাইলে অপারেটরদের বক্তব্য অনুযায়ী। অর্থাৎ ৫০০ টাকায় প্রথম ধাপে কর আদায় করা হবে ২৯০ টাকা, সাথে ১০ টাকা চার্জ।
যদি ইমারজেন্সি ব্যালেন্স গ্রহণ করার সময় একবার এবং দ্বিতীয় দফায় পরিশোধ করার সময় আরেকবার এভাবে কর আদায় করা হয় তাহলে কি পারে? ফলে এই সুবিধা গ্রাহকের জন্য কতটা উপকারী, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, মোবাইল ব্যালেন্স লোন মূলত গ্রাহকের সাময়িক যোগাযোগের সংকট মোকাবিলার একটি সুবিধা। কিন্তু এই সুবিধা গ্রহণের জন্য সার্ভিস চার্জের পাশাপাশি কর আরোপ এবং পরিশোধের সময় পুনরায় কর কেটে নেওয়া হলে গ্রাহকের প্রকৃত ব্যয় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, একজন গ্রাহক যখন ৫০০ টাকা ব্যালেন্স লোন নেন, তখন তাঁর প্রত্যাশা থাকে যে তিনি নির্ধারিত শর্তে ওই অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন এবং পরবর্তী রিচার্জ থেকে ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু ঋণ গ্রহণ, সার্ভিস চার্জ এবং ঋণ সমন্বয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক বা অন্যান্য কর হিসাব করা হচ্ছে, তা গ্রাহকের কাছে স্পষ্ট না হলে এই ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব বলা যায় না। একই অর্থের ওপর একাধিকবার করের বোঝা পড়ছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
প্রতিটি পর্যায়ে কর কাটা হলেই আইনগতভাবে একই কর দ্বিগুণ আদায় হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে ঋণ হিসেবে দেওয়া ব্যালেন্স, সার্ভিস চার্জ, ব্যবহৃত টেলিযোগাযোগ সেবা এবং পরবর্তী রিচার্জ থেকে ঋণ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোন খাতে কী হারে কর প্রযোজ্য হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করতে হবে। গ্রাহককে একই সেবার জন্য অস্বচ্ছ বা পুনরাবৃত্ত করের বোঝা বহন করতে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, ৫০০ টাকা ব্যালেন্স লোনের বিপরীতে ১০ টাকা সার্ভিস চার্জের পাশাপাশি করের হিসাব এমনভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত, যাতে গ্রাহক ঋণ গ্রহণের আগেই জানতে পারেন—তিনি প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যবহার করতে পারবেন, কত টাকা চার্জ দিতে হবে এবং পরবর্তী রিচার্জ থেকে মোট কত টাকা কেটে নেওয়া হবে। এসব তথ্য গোপন রেখে বা জটিল শর্তের আড়ালে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হলে তা গ্রাহকের আস্থার পরিপন্থী হবে।
অ্যাসোসিয়েশনের দাবি,
১. কর কাঠামোর স্বচ্ছতা: মোবাইল ব্যালেন্স লোন গ্রহণ, ব্যবহার ও পরিশোধের প্রতিটি পর্যায়ে কী পরিমাণ ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও অন্যান্য কর প্রযোজ্য, তার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
২. দ্বৈত করের অভিযোগ তদন্ত: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) যৌথভাবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে আইনগতভাবে একই কর একাধিকবার আরোপ করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে।
৩. সর্বমোট কর্তনের তথ্য: গ্রাহক ৫০০ টাকা লোন নিলে সার্ভিস চার্জ, প্রযোজ্য কর এবং অন্যান্য কর্তনসহ তাঁর কাছ থেকে মোট কত টাকা আদায় করা হবে, তা লোন গ্রহণের আগেই জানাতে হবে।
৪. গ্রাহকবান্ধব নীতিমালা:জরুরি যোগাযোগের জন্য দেওয়া ব্যালেন্স লোনকে অপারেটরদের অতিরিক্ত আয়ের মাধ্যম না বানিয়ে স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত ও গ্রাহকবান্ধব সেবা হিসেবে পরিচালনা করতে হবে।
৫. অন্যায্য কর্তন বন্ধ: প্রযোজ্য আইন ও বিধির বাইরে কোনো চার্জ বা কর আদায় করা হলে তা বন্ধ করতে হবে এবং প্রমাণিত অতিরিক্ত কর্তনের অর্থ গ্রাহককে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।গ্রাহককে স্বস্তি দিতে হবে, বাড়তি বোঝা নয়।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন অবিলম্বে এই ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ব্যয় ও কর কাঠামো প্রকাশ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং গ্রাহকের আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে।



