টেকসিঁড়ি রিপোর্ট : আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে (আইএমএসও) প্রথমবারের মতো স্বর্ণপদক জিতে নতুন ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের ১৬ খুদে শিক্ষার্থীর ১৫ জনই পদক জয় করতে সক্ষম হয়েছে। দেশের ঝুলিতে এসেছে ১টি স্বর্ণ, ৭টি রৌপ্য এবং ৭টি ব্রোঞ্জপদক।
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায় ২ থেকে ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ২৩তম এই আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে বিশ্বের ২৩টি দেশের ৪ শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ১৫টি পদক অর্জন করে পদকজয়ী দেশগুলোর তালিকায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন।
বিজ্ঞানে প্রথম স্বর্ণ ও গৌরবময় সাফল্য
আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নিয়েই বিজ্ঞানে প্রথম সোনা জয়ের গৌরব অর্জন করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। দেশের হয়ে ঐতিহাসিক স্বর্ণপদকটি অর্জন করেছে মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসান।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে তাহমিদ বলে, ‘স্বর্ণপদক পাওয়ার ইচ্ছা নিয়েই এসেছিলাম। তত্ত্বীয়-২–এ কয়েকটি সাধারণ ভুল করে একটু দুশ্চিন্তা ছিল, তবে ব্যবহারিক পরীক্ষা সেটা পুষিয়ে দিয়েছে। সোনার পদক পেয়ে খুবই ভালো লাগছে।’
বিজ্ঞান বিভাগে বাংলাদেশ দল ১টি স্বর্ণ, ৪টি রৌপ্য ও ২টিতে ব্রোঞ্জপদক অর্জন করেছে। রৌপ্যপদক জয়ীরা হলেন—অভিজ্ঞান রায়, মোহাম্মদ মুশরিফ আলম, রাইয়ান আফরাদ ও আরহাম আবিদ। ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে রাফসান শফিক তালুকদার ও সাহাবী ইবনে কাব্য। উল্লেখ্য, দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য মুশরিফ ও রাইয়ান দুজনই চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
গণিতে ১০০% সাফল্য
গণিত বিভাগেও দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এই বিভাগে অংশ নেওয়া ৮ জন প্রতিযোগীর সবাই পদক জয় করেছেন। দলগতভাবে গণিতে এসেছে ৩টি রৌপ্য ও ৫টি ব্রোঞ্জপদক। বিশেষ বিষয় হলো, গণিত দলের এই আট সদস্যের সবাই ঢাকার সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থী।
গণিত দলে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে রৌপ্যপদক অর্জন করেছে অরিজিৎ সাহা। অন্য দুই রৌপ্যজয়ী হলেন ইহান আবরাদ রহমান ও মো. সামিন সাইফ। এ ছাড়া ব্রোঞ্জপদক পেয়েছে মো. নাবি হোসেন, আলী ওমর, শারাফ বিন আনোয়ার, মো. শাহিদ মোরসালিন ও ইরতিশ জায়েদ লিয়াম। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাহমিদ ও অরিজিতের জন্য এটিই ছিল বয়সভিত্তিক এই আসরে শেষ অংশগ্রহণ।
সাফল্যের ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এর আগে মালয়েশিয়ার কেদাহে অনুষ্ঠিত ২২তম আসরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছিল। সেবার ১২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ২টি রৌপ্য ও ১০টি ব্রোঞ্জসহ সবাই পদক অর্জন করেছিল। এবার প্রতিযোগীর সংখ্যা এবং পদক অর্জন—দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এই অনন্য অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ও সংগঠকগণ। দলনেতা তানভীরুল ইসলাম, বিজ্ঞানের প্রশিক্ষক মীম নাজ রহমান ও গণিতের প্রশিক্ষক সামিরা সুমাইয়া দলের এমন ফলাফলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বিজ্ঞানের প্রশিক্ষক মীম নাজ রহমান বলেন, ‘প্রতিযোগীদের একাগ্রতা, অভিভাবকদের পরিশ্রম আর মেন্টরদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যার সমন্বয়েই এই চমৎকার সাফল্য এসেছে।’
আন্তর্জাতিক এই আয়োজনে বাংলাদেশ দলের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি (এসপিএসবি)। দেশে এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা ছিল বিডিওএসএন, এসপিএসবি ও ম্যাসল্যাব।
ভবিষ্যতে এমন আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড বাংলাদেশে আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে এসপিএসবির সভাপতি মুনির হাসান বলেন, ‘আমার মনে হয়, এবার আমাদের পরবর্তী ধাপ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশকেও একটি বড় আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডের আয়োজক হতে হবে।’


