এএইচএম বাজলুর রহমান : এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ বাড়ালেই চলবে না। সংযোগের মান, নির্ভরযোগ্যতা, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও দক্ষতার ব্যবধান নির্ধারণ করবে কারা এআইয়ের সুবিধা পাবে। এসকাপের নতুন প্রতিবেদন বলছে এই তথ্য।
একটি এলাকায় ইন্টারনেট আছে, কিন্তু দুর্যোগের সময় সংযোগ থাকে না। আরেক এলাকায় দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় যন্ত্রেই তথ্য বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে সহায়তা পাওয়া যায়। দুই এলাকাকেই ‘ইন্টারনেট সংযুক্ত’ বলা সম্ভব। কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাদের এক নয়।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের, এসকাপের, এশিয়া-প্যাসিফিক ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন রিপোর্ট ২০২৬ এই ব্যবধানকে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনের বিষয় AI-native network infrastructure: এমন ডিজিটাল অবকাঠামো, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কেবল নেটওয়ার্কে চলা একটি অ্যাপ নয়; নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা, পরিচালনা ও সম্পদ বণ্টনের ব্যবস্থার মধ্যেই যুক্ত। এসকাপের মতে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কত মানুষ সংযুক্ত, তা দিয়ে বিচার করলে বোঝা যাবে না। সংযোগ কতটা নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দিতে সক্ষম, সেটিও দেখতে হবে।
কথাটি শুনতে প্রযুক্তিগত, কিন্তু এর প্রভাব পরিচিত। দুর্যোগের সতর্কবার্তা, মোবাইল আর্থিক সেবা, কৃষকের তথ্য পাওয়া কিংবা সরকারি সেবা চালু রাখা, সবকিছুই নির্ভর করে বিদ্যুৎ, সংযোগ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং নিরাপত্তা একসঙ্গে কাজ করার ওপর। নেটওয়ার্কে এআই যুক্ত হলে কোনো ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা বা চাহিদা অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন সহজ হতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা গড়তে অর্থ, দক্ষ কর্মী, উপযোগী তথ্য ও শক্তিশালী তদারকি দরকার। প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা আর সব দেশে তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাই এক নয়।
গড় হিসাব যে বৈষম্য আড়াল করে
এসকাপের হালনাগাদ ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স বিশ্বের ১১০টি অর্থনীতির তথ্য বিবেচনা করেছে। এতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গড় স্কোর ৫০ দশমিক ২৮, যা বৈশ্বিক গড় ৪৯ দশমিক ৬৩-এর সামান্য ওপরে। কিন্তু এই সামান্য ব্যবধান দিয়ে অঞ্চলটির বাস্তব অবস্থা বোঝা কঠিন। বিস্তারিত মূল্যায়ন করা ২৯টি আঞ্চলিক অর্থনীতির মধ্যে শুধু সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া ‘ডিজিটাল লিডার’। আরও পাঁচটি ‘অ্যাডভান্সড পারফরমার’; অধিকাংশ অর্থনীতি তার নিচের দুই স্তরে রয়েছে।
প্রতিবেদনটি এই পরিস্থিতিকে সংযোগের ‘মানগত বিভাজন’ হিসেবে দেখছে। আগে প্রধান প্রশ্ন ছিল কার ইন্টারনেট আছে, কার নেই। এখন প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত: সংযোগের গতি ও স্থিতি কেমন, স্থানীয়ভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ আছে কি, দক্ষ জনবল পাওয়া যায় কি এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পরিবেশ আছে কি? উন্নত অবকাঠামো, পুঁজি ও দক্ষতা যাদের আগে থেকেই রয়েছে, এআইয়ের সুফল তাদের কাছেই বেশি জমা হওয়ার ঝুঁকি আছে।
বাংলাদেশকে প্রতিবেদনে আটটি ‘ফাউন্ডেশনাল ডেভেলপার’ অর্থনীতির একটি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এটি দেশটির সব ডিজিটাল উদ্যোগের একক মূল্যায়ন নয়; সূচকের নির্ধারিত ক্ষেত্র ও উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তুলনামূলক অবস্থান। তবে বার্তাটি গুরুত্বের দাবি রাখে। এআই নিয়ে বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি সাশ্রয়ী সংযোগ, স্থিতিশীল নেটওয়ার্ক, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের মৌলিক শর্তগুলো কোথায় দুর্বল, তা যাচাই করতে হবে।
‘এআই-নেটিভ’ মানেই এখনই ৬জি নয় , এসকাপের ভাষায়, এআই-নেটিভ অবকাঠামো তিনটি ধারাকে এক জায়গায় আনে: নেটওয়ার্ক পরিচালনায় এআই, এআই অ্যাপ্লিকেশন চালানোর উপযোগী সংযোগ ও কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং তথ্যের উৎসের কাছাকাছি, অর্থাৎ স্থানীয় যন্ত্র বা নেটওয়ার্কের প্রান্তে, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ। এতে সব তথ্য দূরের ডেটা সেন্টারে পাঠানোর প্রয়োজন কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে; সময়ও বাঁচতে পারে। প্রতিবেদনটি ভবিষ্যতের ষষ্ঠ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক বা ৬জির সম্ভাবনার সঙ্গেও এই পরিবর্তনকে যুক্ত করেছে।
কিন্তু এখান থেকে সব দেশের জন্য একই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত আসে না। কোনো অঞ্চলে প্রাথমিক সংযোগই অনির্ভরযোগ্য হলে সেখানে অত্যাধুনিক এআই অবকাঠামোর আগে বিকল্প সংযোগপথ, বিদ্যুৎ এবং সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অধিক জরুরি হতে পারে। এসকাপও উন্নয়নের ভিন্ন পর্যায়ে থাকা অর্থনীতির জন্য ভিন্ন নীতিপথ দিয়েছে। ভিত্তি গড়ার পর্যায়ে থাকা দেশগুলোর জন্য গ্রামীণ সংযোগ, সাশ্রয়ী সেবা, বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় বিকল্প সংযোগের ওপর জোর দিয়েছে। অন্যদিকে বেশি অগ্রসর অর্থনীতির জন্য উন্মুক্ত প্রযুক্তিগত মান, বিভিন্ন সরবরাহকারীর ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
একটি তার ছিঁড়লে কী হয়
নির্ভরযোগ্যতার গুরুত্ব বোঝাতে প্রতিবেদনটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ টোঙ্গার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। ২০২২ সালে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও সুনামিতে দেশটির একমাত্র আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কয়েক সপ্তাহ বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। শিক্ষাটি সহজ: ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা বা জরুরি যোগাযোগ যদি একটি পথের ওপর নির্ভর করে, সেই পথের ব্যর্থতা বহু সেবাকে একসঙ্গে বিপর্যস্ত করতে পারে। বিকল্প কেবল, বেতার বা স্যাটেলাইট সংযোগ তাই বিলাসিতা নয়; গুরুত্বপূর্ণ সেবার স্থায়িত্বের প্রশ্ন।
এই যুক্তি শুধু দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য নয়। যে দেশই ডিজিটাল সেবাকে অপরিহার্য জনপরিকাঠামো হিসেবে গড়ে তুলবে, তাকে আগেই জানতে হবে: বিদ্যুৎ না থাকলে কী হবে, একটি সংযোগপথ বন্ধ হলে তথ্য কোন পথে যাবে, সাইবার হামলা বা সফটওয়্যারের ত্রুটিতে সেবা কীভাবে চালু রাখা হবে?
দক্ষতা ও নিরাপত্তা ছাড়া বিনিয়োগ অসম্পূর্ণ
এআই-সমৃদ্ধ নেটওয়ার্ক নতুন সক্ষমতা দেয়, কিন্তু নতুন নির্ভরতাও তৈরি করে। দামি চিপ, কম্পিউটিং অবকাঠামো ও মৌলিক এআই মডেলের বাজার অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে দেশগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অন্যের ওপর আরও নির্ভরশীল হতে পারে। আন্তসংযুক্ত ব্যবস্থায় একটি ত্রুটি দ্রুত বহু সেবায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও আছে। এসকাপ তাই উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তিগত মান, সাইবার নিরাপত্তায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ডেটা সেন্টারের পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ও পানির দক্ষ ব্যবহারের কথা বলেছে।
এখানে একটি নীতিগত ভুল এড়ানো জরুরি: যন্ত্রপাতি কেনাকে সক্ষমতা তৈরি বলে ধরে নেওয়া। নেটওয়ার্কের মান পরীক্ষা, তথ্য সুরক্ষা, ক্রয়চুক্তি মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তির ফল যাচাই করতে দক্ষ মানুষ চাই। বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট পৌঁছানোও যথেষ্ট নয়; শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারযোগ্য শিক্ষাসামগ্রী ছাড়া সেই সংযোগের সুফল সীমিত থাকবে।
এসকাপের প্রতিবেদনটির মূল শিক্ষা এআইয়ের দৌড়ে দ্রুত নামার আহ্বান নয়। শিক্ষা হলো প্রস্তুতির ক্রম ঠিক করা। যেখানে সংযোগ ভঙ্গুর, সেখানে আগে স্থায়িত্ব; যেখানে সেবা ব্যয়বহুল, সেখানে আগে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার; যেখানে দক্ষতার অভাব, সেখানে আগে মানুষে বিনিয়োগ। এরপর দেখতে হবে কোন এআই ব্যবস্থা বাস্তবে জনসেবা উন্নত করছে এবং তার ব্যয়, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের শর্ত গ্রহণযোগ্য কি না।
ডিজিটাল বৈষম্যের পরবর্তী অধ্যায়ে কেবল ‘অনলাইনে আছি’ বলা যথেষ্ট হবে না। প্রশ্ন হবে, প্রয়োজনের মুহূর্তে সংযোগটি কাজ করে কি না এবং তার ওপর গড়ে ওঠা প্রযুক্তির সুবিধা কতজন মানুষের কাছে পৌঁছায়।
সূত্র: জাতিসংঘ এসকাপ, Asia-Pacific Digital Transformation Report 2026: AI-native Network Infrastructure for a Future Digital Economy, প্রকাশিত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
লেখক পরিচিতি – অ্যাম্বাসেডর ফর রেসপন্সিবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) অ্যান্ড অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)


