মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক মৃধা (সোহেল মৃধা) ঃ দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা, আইনি জটিলতা আর নেতৃত্বহীনতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভোটের ধারায় ফিরেছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক আদেশ এবং নির্বাচন বোর্ডের ঘোষিত তফসিলে সাধারণ সদস্যদের মনে নিজেদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দ ও স্বস্তি এসেছে।
২০১৪-১৫ সালে ই-ক্যাব প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে আমাদের মতো সাধারণ সদস্যদের টানা আন্দোলন, সংগ্রাম ও লেখার মুখে ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়। তরুণ ও ছোট উদ্যোক্তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া সহজ করতে আমরা আন্দোলন করে মনোনয়ন ফি ৭৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে এনেছিলাম। ফলে তরুণ ও অরাজনৈতিক উদ্যোক্তারা নেতৃত্বে আসার সুযোগ পান। কিন্তু ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই নির্বাচন হওয়ার बात থাকলেও তৎকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়।
এরপর বিগত সরকারের আমলে দুই দফায় সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও ই-ক্যাব আইনি বেড়াজালে আটকে পড়ে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের করা রিট পিটিশনের (নং ১২৭২৯/২০২৪) কারণে আদালতের স্থগিতাদেশ আসে। মূলত সরাসরি ব্যালটের লড়াই এড়াতে এবং ‘পকেট কমিটি’ গঠনের অপকৌশল হিসেবেই রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছিল।
অ্যাসোসিয়েশনের অস্তিত্ব ও শিল্প রক্ষার মূল সংকট
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে ১৮০ দিনের বেশি সময় ধরে ই-ক্যাবে নির্বাচিত নেতৃত্ব না থাকায় পুরো ই-কমার্স খাত চরম অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। নিবন্ধিত ৩ হাজারের বেশি সদস্য প্রতিষ্ঠানসহ দেশে প্রায় ৫ লাখ সাধারণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রয়েছে, যাদের বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ২২ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা।
একটি বাণিজ্য সংগঠনকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রেখে পেশাদার ও অরাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে তুলে দেওয়া এবং সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। একজন সরকারি প্রশাসক কেবল দৈনন্দিন দাপ্তরিক নথি সই করতে পারেন; কিন্তু নতুন বাজার তৈরি, উদ্ভাবন বা ব্যবসায়ীদের নীতিগত সংকট মোকাবিলা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘদিন নির্বাচিত বোর্ড না থাকায়:
ডিবিআইডি (DBID) সহজীকরণ: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল বিজনেস আইডি (DBID) বছরের পর বছর পার হলেও জটিল আমলাতন্ত্রের কারণে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। এটি সহজ করার বদলে ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনবিআর-এর e-TIN সার্ভিস যেমন ঘরে বসে মুহূর্তেই পাওয়া যায়, ডিবিআইডি-কেও ঠিক সেভাবে সহজ ও স্বয়ংক্রিয় (Automated) করা এখন সময়ের দাবি।
ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা: দেশে ৫ লাখ ই-কমার্স ও এফ-কমার্স উদ্যোক্তার বড় একটি অংশ নারী ও তরুণ। নির্বাচিত অরাজনৈতিক প্রতিনিধি না থাকায় লজিস্টিকস ও কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর মনোপলি, অতিরিক্ত চার্জ ও হয়রানির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ গড়ে তোলা যায়নি।
নতুন সরকারের নীতিগত সুবিধা: গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গঠিত নতুন সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে যে বৈষম্যহীন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে কর ছাড়, ভ্যাট রেয়াত ও সহজ ঋণের বিষয়ে দলীয় প্রভাবমুক্ত দরকষাকষি বন্ধ ছিল।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (Cross-border e-commerce) ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে নির্বাচিত ও পেশাদার প্রতিনিধি না থাকা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন ও আইনি প্রক্রিয়ার সাফল্য
ই-ক্যাবে অরাজনৈতিক পরিবেশ ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সদস্যদের পক্ষ থেকে আমি নিজে গত ৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিই (যার অনুলিপি বাণিজ্য মন্ত্রী ও সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পাঠানো হয়)। স্মারকলিপিতে রিট পিটিশনটির জরুরি শুনানির ব্যবস্থা করে আইনি বাধা দূর করা এবং ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২৫’ অনুযায়ী সরাসরি ব্যালটে অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশনটি (নং ১১৬০০/২০২৫) নিষ্পত্তি হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্বাচন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে (স্মারক নম্বর: ২৬.০০.০০০০.০০০.০৪৩.৯৯.০০১.২৫-১৬) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক আদেশে ডব্লিউটিও শাখা-৫ এর উপসচিব জনাব শরীফ মোস্তাফিজুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ৩ সদস্যের নির্বাচন বোর্ড এবং যুগ্মসচিব জনাব সুফিয়া আক্তার রুমীকে চেয়ারম্যান করে ৩ সদস্যের আপিল বোর্ড গঠন করে।
পুনর্গঠিত নির্বাচন বোর্ড:
চেয়ারম্যান: জনাব শরীফ মোস্তাফিজুর রহমান, উপসচিব (ডব্লিউটিও শাখা-৫, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
সদস্য: জনাব ফিরোজ আল মামুন, উপসচিব (পরিকল্পনা-১ শাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
সদস্য: জনাব মোঃ সিরাজুল ইসলাম, উপনিয়ন্ত্রক (এফটিএ-৪, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
পুনর্গঠিত নির্বাচন আপিল বোর্ড:
চেয়ারম্যান: জনাব সুফিয়া আক্তার রুমী, যুগ্মসচিব (টিএসএম অধিশাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
সদস্য: মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, যুগ্মসচিব (প্রশাসন-২ অধিশাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
সদস্য: মোঃ মাহবুবুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব (টিএসএম-১ শাখা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)
২০২৬-২০২৮ মেয়াদের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী সময়সূচী ও পদের তথ্য।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্মারক নম্বর ই-ক্যাব/নির্বাচন বোর্ড/২০২৬-২০২৮/০১ অনুযায়ী ১১টি পদের (সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, অর্থ সম্পাদক ও ৫টি পরিচালক পদ) জন্য নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়:
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফসিল ও আচরণবিধি প্রকাশ।
১৯ অক্টোবর ২০২৬ (সোমবার, বিকাল ৫টা): সদস্যপদ নবায়ন, বকেয়া চাঁদা (৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত) পরিশোধ ও কাগজপত্র জমার শেষ সময়।
২৯ অক্টোবর ২০২৬: প্রাথমিক ভোটার তালিকা প্রকাশ।
৩০ অক্টোবর – ০১ নভেম্বর ২০২৬: প্রাথমিক ভোটার তালিকার ওপর আপিল বোর্ডে আপত্তি দাখিল।
০৫ – ০৬ নভেম্বর ২০২৬: নির্বাচন বোর্ড কর্তৃক চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ।
০৬ – ১২ নভেম্বর ২০২৬: নির্বাচন বোর্ড/সমিতি অফিস হতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল।
২৫ নভেম্বর ২০২৬: বৈধ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ।
২৬ – ২৮ নভেম্বর ২০২৬: লিখিতভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়।
২৮ নভেম্বর ২০২৬: চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ।
১৯ ডিসেম্বর ২০২৬ (শনিবার): সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ।
২৩ ডিসেম্বর ২০২৬: নির্বাচন বোর্ড কর্তৃক চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা।
মনোনয়নপত্র ফি (অফেরৎযোগ্য) [স্মারকঃ ই-ক্যাব/নির্বাচন বোর্ড/২০২৬-২০২৮/০২]:
সভাপতি: ১,২০,০০০/- টাকা | সিনিয়র সহ-সভাপতি: ১,১০,০০০/- টাকা | সহ-সভাপতি: ১,০৫,০০০/- টাকা
সাধারণ সম্পাদক: ১,০০,০০০/- টাকা | যুগ্ম সম্পাদক: ৮০,০০০/- টাকা | অর্থ সম্পাদক: ৭০,০০০/- টাকা
পরিচালক (৫টি পদ): প্রতি পদের জন্য ৫০,০০০/- টাকা
নতুন নেতৃত্বের প্রতি শুভকামনা ও শুভ বুদ্ধি উদয়ের আহ্বান
এই নির্বাচনে যারা অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের সবাইকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। ই-ক্যাবে অরাজনৈতিক ও সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন :
১. মনোনয়ন ফি কমানোর আকুল আবেদন: ই-ক্যাবের ৯৯ ভাগ সদস্যই ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) উদ্যোক্তা। তফসিলে সভাপতি পদে ১ লাখ ২০ হাজার ও পরিচালক পদে ৫০ হাজার টাকা ফি রাখা হয়েছে, যা ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ। ২০২২ সালের মতো ফি কমিয়ে এটি সাধ্যের মধ্যে আনার জন্য নির্বাচন বোর্ডের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
২. প্রার্থীদের প্রতি শুভকামনা: নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া প্রতিটি প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতি শুভকামনা রইল। কোনো দলীয় কাদা ছোড়াছুড়ি না করে সবাই যেন ই-কমার্স খাতের সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিযোগিতা করেন।
৩. আইনি ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ বন্ধের অনুনয়: অতীতে যেমন রিটের অজুহাতে ও রাজনৈতিক প্রভাবে সাধারণ সদস্যদের ভোটাধিকার আটকে দেওয়া হয়েছিল, এবার যেন কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে আর সেই চেষ্টা করা না হয়। কোনো অপশক্তি যেন নির্বাচন পণ্ড করতে না পারে, সেজন্য সব সদস্যকে সজাগ থাকতে হবে।
৪. স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ভোট: বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী ভুয়া প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে কেবল প্রকৃত উদ্যোক্তাদের নিয়ে নির্ভুল ভোটার তালিকা করতে হবে। যেকোনো দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া গোপন ব্যালটে নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচন বোর্ডের দায়িত্ব।
ই-ক্যাবকে একটি অরাজনৈতিক, স্বাবলম্বী ও পেশাদার সংগঠন হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা এবং ৫ লাখ উদ্যোক্তার স্বপ্ন সুরক্ষিত করা আমাদের যৌথ দায়িত্ব। নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলিয়ে নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড একটি সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দেবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
আসুন, সব বাধা দূর করে আগামী ১৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আমরা সবাই মিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিই। জয় হোক মেম্বারদের অধিকারের, ই-ক্যাবে ফিরে আসুক যোগ্য, পেশাদার ও অরাজনৈতিক নতুন নেতৃত্ব!
লেখক পরিচিতি – ফাউন্ডিং মেম্বার, ই-ক্যাব; উদ্যোক্তা ও ই-কমার্স বিশ্লেষক



