এ. এইচ. এম. বজলুর রহমানঃকল্পনা করুন, বাংলাদেশের ভোলা দ্বীপের লালমোহন উপজেলার ফুলবাগিচা গ্রামের একজন নারী একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন। একটি এআই ব্যবস্থা তাঁর তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করল। স্থানীয় কার্যালয় এর কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। তাঁর নথিতে কোনো ভুল থাকলে তিনি কোথায় তা সংশোধন করবেন? সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কীভাবে আপিল করবেন? প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা হয়তো প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে থাকবে। কিন্তু তাঁর বাদ পড়ার দায় কে নেবে?
এই কাল্পনিক পরিস্থিতি বাংলাদেশে এআই শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে। কোনো সরকারি সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যখন মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে এআই ব্যবহার করে, তখন এই ক্ষমতার সীমা কে নির্ধারণ করবে? কিছু ভুল হলে দায় কার, আর ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে কোন প্রতিষ্ঠান দাঁড়াবে? জাতীয় সংসদের এআই-বিষয়ক আলোচনা এখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
৭ অক্টোবর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) “Parliaments and Artificial Intelligence: Governing AI in the Public Interest” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি, বাজেট পর্যালোচনা ও জনপ্রতিনিধিত্বের মতো সংসদের দায়িত্বগুলোকে এআই শাসনের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য স্পষ্ট: এআই-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাহী বিভাগ ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মধ্যকার আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে কুয়ালালামপুরের একটি সম্মেলনে ৬৫টি দেশের ২০০-র বেশি সংসদ সদস্য ও সংসদ কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্বেগের মধ্যে ছিল ডিপফেক, নজরদারি, কর্মসংস্থান, বৈষম্য এবং হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির হাতে প্রযুক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন।
প্রতিবেদনে ৬০টিরও বেশি দেশে এআই নিয়ে সংসদীয় উদ্যোগের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবু কমিটি গঠন বা আইন পাসকে কার্যকর সুরক্ষার প্রমাণ ভাবা ঠিক নয়। আসল পরীক্ষা হলো, এসব পদক্ষেপ ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে পারছে কি না এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিকার নিশ্চিত করছে কি না।
বাংলাদেশের সংসদকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। ৭৬ অনুচ্ছেদ সংসদীয় কমিটিগুলোকে বিল পরীক্ষা, আইনের প্রয়োগ পর্যালোচনা এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদন্তের ভিত্তি দেয়। এআই নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে, কিন্তু সেসব প্রশ্ন করার সাংবিধানিক সুযোগ আগে থেকেই আছে।
সরকারের এআই নীতি-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে এখনও ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬–২০৩০’-এর খসড়া ২.০ দেখানো হচ্ছে এবং আনুষ্ঠানিক গ্রহণের বিষয়ে পরবর্তী ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। তাই সংসদের কাজ হওয়া উচিত খসড়ার অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং এর জবাবদিহি-কাঠামো খতিয়ে দেখা। নীতি দিকনির্দেশনা দিতে পারে। কিন্তু নীতিতে কোনো অধিকারের উল্লেখ থাকলেই সেই অধিকার আইনত প্রয়োগযোগ্য হয়ে যায় না।
একটি সর্বাত্মক এআই আইন পাস করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন ধারণাও সমান বিভ্রান্তিকর। ব্যক্তিগত তথ্য, শ্রম, ভোক্তা সুরক্ষা, বৈষম্য, সরকারি ক্রয় ও নির্বাচন-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধানগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। এতে বোঝা যাবে কোথায় সেগুলো যথেষ্ট, কোথায় ফাঁক আছে এবং কোথায় প্রয়োগ দুর্বল। নতুন আইন সেই ফাঁকগুলো পূরণ করবে। প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থ ছাড়া কোনো বিদেশি কাঠামো হুবহু নকল করলে কাগজে-কলমে শক্তিশালী ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, অথচ নাগরিকেরা অরক্ষিতই থেকে যাবেন।
আবার এআই-কে শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সংসদীয় কমিটির হাতে ছেড়ে দেওয়াও ঠিক নয়। হাসপাতালে এআই নিয়ে প্রশ্ন স্বাস্থ্য কমিটির সামনে যাওয়া উচিত। নিয়োগ ও কর্মমূল্যায়নে এর ব্যবহার শ্রম কমিটির বিষয়। শিক্ষার্থী মূল্যায়নে এর ব্যবহার শিক্ষা কমিটির। একটি নির্ধারিত সংসদীয় কমিটি এই কাজের সমন্বয় করতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর দায়িত্ব, তথ্যে তাদের প্রবেশাধিকার এবং প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা স্পষ্ট থাকতে হবে।
সংসদের স্বাধীনভাবে বিচার করার সক্ষমতাও দরকার। সদস্যদের সবাইকে প্রযুক্তিবিদ হতে হবে না। তবে কোনো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে কী প্রশ্ন করতে হবে, কী ধরনের প্রমাণ চাইতে হবে এবং কোন দাবিগুলো যাচাই করা দরকার, তা তাঁদের জানতে হবে। এই সক্ষমতা গড়তে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ একটি ‘এআই ও সংসদ ল্যাব’ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সংসদ সচিবালয়ের অধীনে থাকা এই ল্যাবে আইন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও মানবাধিকার বিষয়ে দক্ষ একটি স্থায়ী গবেষণা ও পরামর্শক দল থাকবে।
ল্যাবটি সংসদীয় কমিটিগুলোর জন্য এআই-সংক্রান্ত বিল ও নীতির বিশ্লেষণ তৈরি করবে। সরকারি এআই প্রকল্পের ব্যয় ও অধিকারগত প্রভাব পরীক্ষায় সহায়তা করবে এবং গণশুনানির জন্য প্রমাণভিত্তিক প্রশ্ন তৈরি করবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাধীন গবেষকদের সঙ্গে মিলে এটি বাংলা ও দেশের অন্যান্য ভাষায় বিভিন্ন ব্যবস্থার নির্ভুলতা, বৈষম্যের ঝুঁকি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সেগুলোর অভিগম্যতা মূল্যায়নে সাহায্য করতে পারে। সংসদের ভেতরেই অনুবাদ, প্রতিলিপি তৈরি ও নথি খুঁজে পাওয়ার জন্য এআই-এর ছোট পরিসরের পরীক্ষামূলক ব্যবহারেরও সমন্বয় করতে পারে। সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণও এর কাজের অংশ হবে।
ল্যাবের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাজেট, প্রকাশ্য কর্মপরিকল্পনা এবং দলমত নির্বিশেষে সব সদস্যের জন্য গবেষণা-সহায়তায় সমান প্রবেশাধিকারের ওপর। বিশেষজ্ঞদের স্বার্থের সংঘাত ও অর্থের উৎস প্রকাশ করতে হবে। এর কাজে বিশ্ববিদ্যালয়, নাগরিক সমাজ, নারী সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। কমিউনিটি রেডিও ও স্থানীয় গণমাধ্যম নাগরিকদের প্রশ্ন সংগ্রহ করতে এবং গবেষণার ফল সহজ বাংলায় পৌঁছে দিতে সাহায্য করতে পারে। ল্যাবের সাফল্য মাপা উচিত এই মানদণ্ডে: এর বিশ্লেষণ সংসদের সিদ্ধান্তকে কতটা তথ্যসমৃদ্ধ করছে, সরকারের জবাবদিহি কতটা জোরদার করছে এবং নাগরিকদের কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে।
একটি জরুরি অগ্রাধিকার হলো, সরকারি সংস্থাগুলো কোথায় ও কী উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করছে, তার একটি তালিকা চাওয়া। ক্রমে একটি প্রকাশ্য নিবন্ধন-তালিকা তৈরি করতে হবে, যাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সরবরাহকারী, ব্যবহৃত তথ্যের ধরন, সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি এবং অভিযোগ জানানোর পথ উল্লেখ থাকবে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৈধ গোপনীয়তা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। কিন্তু গোপনীয়তা যেন পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহির বাইরে রাখার অজুহাত না হয়।
সব এআই ব্যবস্থায় একই নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করার কোনো অর্থ হয় না। একটি সাধারণ নথির সারসংক্ষেপ তৈরি আর সামাজিক সহায়তার যোগ্যতা নির্ধারণের ঝুঁকি এক নয়। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ঋণ, কর্মসংস্থান বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে যেসব ব্যবস্থা মানুষের অধিকারের ক্ষতি করতে পারে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আগে থেকে প্রভাব মূল্যায়ন ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। ঝুঁকি যত বেশি, প্রমাণ ও তদারকির শর্ত তত কঠোর হওয়া উচিত। কম ঝুঁকির উদ্ভাবনের নিয়ম আরও সহজ ও আনুপাতিক হতে পারে।
কোনো সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে গুরুতর বিরূপ প্রভাব ফেললে তিনি যেন অর্থবহ মানবিক পর্যালোচনা পান। কোনো কর্মকর্তার হাতে একটি ‘অনুমোদন’ বোতাম তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সেই কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বদলানোর ক্ষমতা, তা যাচাই করার মতো তথ্য এবং তার জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা, ভুল তথ্য সংশোধনের উপায় এবং সাধ্যের মধ্যে আপিলের পথ দিতে হবে। প্রতিকার পেতে দামি স্মার্টফোন বা জটিল অনলাইন ফর্ম লাগলে সুরক্ষা অনেক মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে।
সরকারি এআই ক্রয়ে সংসদীয় নজরদারি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যবস্থার ক্রয়মূল্য মোট ব্যয়ের একটি অংশ মাত্র। চলমান ব্যবহার, হালনাগাদ, তথ্য সংরক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং সরবরাহকারী বদলানোর খরচও হিসাবে ধরতে হবে। চুক্তিতে অডিট, ত্রুটি সংশোধন, তথ্য ব্যবহারের সীমা এবং ক্ষতির দায় স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। বৈধ বাণিজ্যিক গোপনীয়তা রক্ষা করেও স্বাধীন পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। জনগণের অর্থে কেনা প্রযুক্তি পরীক্ষা করার অধিকার সরকারকে চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
তাই বাজেট আলোচনায় কতগুলো সার্ভার বা সফটওয়্যার কেনা হলো, তার পাশাপাশি মানুষের সক্ষমতাও বিবেচনা করতে হবে। বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় কার্যকারিতা যাচাই, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অভিগম্যতা নিশ্চিত করা, সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং যাঁদের কাজ বদলে যাচ্ছে তাঁদের সহায়তার জন্য কত অর্থ আছে? প্রকল্পে কারা লাভবান হবেন? এর বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা কত? কোনো প্রকল্পকে সফল ঘোষণার আগে ব্যয়, সুফল ও সামাজিক ক্ষতি একসঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে।
ডিপফেক এবং প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নিয়েও সংসদের একটি স্পষ্ট অবস্থান দরকার। সম্মতি ছাড়া ঘনিষ্ঠ ছবি তৈরি বা ছড়ানো হলে, কিংবা প্রযুক্তি দিয়ে পরিচয় জালিয়াতি ও প্রতারণা করা হলে দ্রুত প্রতিকার ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা পাওয়া যেতে হবে। অভিযোগ জানাতে গিয়ে কাউকে যেন বারবার অপমানিত হতে না হয়। একই সঙ্গে ‘ক্ষতিকর এআই কনটেন্ট’-এর মতো অস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ব্যঙ্গ, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক সমালোচনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আইনে কোন নির্দিষ্ট ক্ষতি ও আচরণ লক্ষ্য করা হচ্ছে তা সংজ্ঞায়িত করতে হবে এবং কনটেন্ট সরানোর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রাখতে হবে।
এআই নিয়ে গণশুনানিতে যদি কেবল প্রযুক্তি কোম্পানি ও রাজধানীর বিশেষজ্ঞদের ডাকা হয়, তাহলে নাগরিকদের অভিজ্ঞতার বড় অংশই বাদ পড়বে। একজন পোশাকশ্রমিক জানতে চাইতে পারেন, একটি যন্ত্র কীভাবে তাঁর কাজের মূল্যায়ন করছে। একজন নারীর জানা দরকার হতে পারে, তাঁর বানোয়াট ঘনিষ্ঠ ছবি ছড়িয়ে পড়লে তিনি কোথায় যাবেন। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জিজ্ঞেস করতে পারেন, কোনো সরকারি সেবায় অভিগম্য বিকল্প আছে কি না। এসব প্রশ্নই আইন প্রণয়ন ও তদারকির অগ্রাধিকার ঠিক করতে সাহায্য করবে।
কমিউনিটি রেডিও, স্থানীয় গণমাধ্যম, শ্রমিক সংগঠন, নারী সংগঠন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন অংশগ্রহণের পথ খুলে দিতে পারে। সংসদীয় আলোচনার সহজ বাংলা সারসংক্ষেপ স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। মানুষের প্রশ্ন লিখিত, মৌখিক ও অফলাইন মাধ্যমে নেওয়া যেতে পারে। সংসদের উচিত প্রকাশ করা, কাদের মতামত পাওয়া গেছে, কোনগুলো গ্রহণ করা হয়েছে এবং অন্যগুলো কেন নেওয়া হয়নি। মতামত সংগ্রহ করা এক কথা, আর সিদ্ধান্তে মানুষের অর্থবহ প্রভাব নিশ্চিত করা আরেক কথা।
নিজের কাজে এআই ব্যবহারের সময়ও সংসদকে একই মানদণ্ড মানতে হবে। নথি খোঁজা, পাঠ্য অনুবাদ ও আলোচনার প্রতিলিপি তৈরিতে এআই সাহায্য করতে পারে। কিন্তু ভুল উদ্ধৃতি বা বানোয়াট আইনি তথ্যসূত্র সংসদের নথিতে ঢুকে গেলে তার মূল্য দিতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকেই। মূল নথি সংরক্ষণ করতে হবে, আউটপুট মানুষকে দিয়ে যাচাই করাতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে প্রকাশ্য প্রক্রিয়ায়। গোপন নথি ও নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে, তাও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায়ও সংসদের ভূমিকা আছে। ইউএনডিপি, আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন (আইপিইউ) ও অন্যান্য আইনসভার সঙ্গে বিনিময় কাজে আসতে পারে। জাতিসংঘে এআই শাসন নিয়ে আলোচনায় সরকার কী অঙ্গীকার করছে এবং দেশে তা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সংসদ সে প্রশ্ন তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক পরামর্শ কাজে লাগানোর সক্ষমতা গড়ে উঠলে নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের সংসদীয় সামর্থ্যই আরও শক্তিশালী হওয়ার কথা।
শুরু হিসেবে সংসদ একটি ৯০ দিনের কর্মসূচি নিতে পারে: এআই ও সংসদ ল্যাবের দায়িত্ব, জনবল ও বাজেটের প্রস্তাব তৈরি করা; সরকারি এআই ব্যবহারের একটি প্রাথমিক তালিকা চাওয়া; সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতে শুনানি করা; এবং বিদ্যমান আইনের ফাঁক পর্যালোচনার সময়সূচি প্রকাশ করা। ছয় মাসের মধ্যে প্রথম অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়া যেতে পারে। মূল্যায়নে দেখতে হবে কতগুলো ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত সংশোধিত হয়েছে, অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগছে এবং স্বাধীন পরীক্ষায় কী কী ত্রুটি ধরা পড়েছে। শুধু প্রশিক্ষণ ও সভার সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপলে মূল প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
সবচেয়ে কঠিন শর্তটি রাজনৈতিক। নির্বাহী বিভাগকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে না পারলে সংসদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা পুরোপুরি কার্যকর হবে না। কমিটির সুপারিশ উপেক্ষিত হলে সংসদকে ব্যাখ্যা চাইতে হবে। নাগরিকদের ক্ষতি নিয়ে দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে আলোচনার চর্চাও দরকার।
লালমোহনের সেই নারীর কাছে এআই মডেলের আকার মোটেই মূল বিষয় নয়। তিনি জানতে চাইবেন, তাঁর আবেদন কেন বাতিল হলো এবং ভুল হয়ে থাকলে তা কে শুধরে দেবে। জাতীয় সংসদ যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চিত করতে পারে, তাহলেই এআই শাসনে জনপ্রতিনিধিত্ব বাস্তব অর্থ পেতে শুরু করবে।
লেখক পরিচিতি – অ্যাম্বাসেডর ফর রেসপন্সিবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) অ্যান্ড অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)



