এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান: যদি কোনো নারী সন্দেহ করেন যে কেউ তার ফোনে নজরদারি করছে, কোনো প্রাক্তন সঙ্গী গোপনে তার অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রবেশ করছে, সম্মতি ছাড়াই তার অন্তরঙ্গ ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে, বা তার ডিভাইসে নজরদারি সফটওয়্যার ইনস্টল করা হয়েছে তাহলে তিনি কোথায় যাবেন? পুলিশের কাছে? সাইবার-সাপোর্ট সেন্টারে? নাকি কোনো প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের কাছে? অথবা তাকে কি প্রথমেই এমন কারও হাতে নিজের ফোন তুলে দিতে হবে, যিনি এটি পরীক্ষা করার সময় তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রায় প্রতিটি বিষয় ছবি, কথোপকথন, সম্পর্ক ও যোগাযোগের তথ্য জেনে ফেলতে পারেন?
এটি নিছক কোনো প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়। এটি সম্মতি, মর্যাদা, নিরাপত্তা, ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
ব্রাজিলের নারীবাদী প্রযুক্তি সংস্থা ‘মারিয়া ল্যাব’-এর কার্ল জ্যানকজ এবং ড্যানি আরোজোর একটি গবেষণা, ‘ফেমিনিস্ট ডিজিটাল ফরেনসিকস: আ স্টাডি অ্যান্ড আ প্রপোজাল ফর ডেভেলপমেন্ট’, ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ডিজিটাল ফরেনসিকের প্রচলিত পদ্ধতিগুলো পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।
ফেমিনিস্ট ইন্টারনেট রিসার্চ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত এই গবেষণায় একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে: তদন্ত প্রক্রিয়াটি যাতে সারভাইভারের (ভুক্তভোগীর) সম্মতি, স্বায়ত্তশাসন বা সুরক্ষা ক্ষুণ্ন না করে, তা নিশ্চিত করে কীভাবে ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তি-নির্ভর জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে?
ফরেনসিক মানে শুধু প্রমাণ খোঁজার চেয়েও বেশি কিছু
ঐতিহ্যগতভাবে ডিজিটাল ফরেনসিক অপরাধ তদন্ত এবং বিচার ব্যবস্থার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এর পরিচিত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিভাইস থেকে তথ্য বের করা, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করা, ডেটা বিশ্লেষণ করা এবং কোনো ঘটনার প্রযুক্তিগত সূত্র পুনর্গঠন করা।
কিন্তু প্রযুক্তি-নির্ভর জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা আরও জটিল একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। একটি ফোনে কেবল সম্ভাব্য অপরাধের প্রমাণের চেয়ে আরও অনেক কিছু থাকতে পারে। এতে অন্তরঙ্গ ছবি, পারিবারিক কথোপকথন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিবরণ, আর্থিক ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্য মানুষের সাথে গোপনীয় যোগাযোগ থাকতে পারে। তাই তদন্তের জন্য কোনো ডিভাইস খোলার অর্থ হতে পারে একটি মানুষের প্রায় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত জীবনকে যাচাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া।
এ কারণেই মারিয়া ল্যাবের গবেষণায় সম্মতি-ভিত্তিক ডিজিটাল ফরেনসিকের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতিটি কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল এবং সারভাইভারের সন্দেহের কোনো প্রযুক্তিগত ভিত্তি আছে কি না, তা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে পারে। একই সাথে এটি সম্মতি এবং স্বায়ত্তশাসনকে তদন্ত প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
এখান থেকে এমন একটি নীতি বেরিয়ে আসে যা অস্বীকার করা কঠিন: ডিজিটাল প্রমাণের সন্ধান যেন মানুষের নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কেড়ে না নেয়।
স্পাইওয়্যার থেকে স্টকারওয়্যার
এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো নজরদারি প্রযুক্তিকে কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনীতি বা মানবাধিকার কর্মীদের নিরাপত্তার ইস্যু হিসেবে বিবেচনা না করা।
পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার শক্তিশালী ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার দিকে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি বাজার গড়ে উঠেছে যা প্রায়ই চোখের আড়ালে থাকে: স্টকারওয়্যার। এই ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে সঙ্গীরা অন্য ব্যক্তির ওপর নজরদারি, হয়রানি বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রযুক্তি-নির্ভর জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা প্রচলিত ডিজিটাল-নিরাপত্তা সহায়তা ব্যবস্থার বাইরেও ঘটতে পারে, বিশেষ করে যখন ভুক্তভোগীরা মানবাধিকার সংস্থা বা প্রতিষ্ঠিত সুশীল সমাজ নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত থাকেন না।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন:
আমরা কি কেবল অপরাধ শনাক্ত করার জন্যই ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা তৈরি করছি, নাকি সারভাইভারদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অধিকার রক্ষার জন্যও?
প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং মানবিক যত্ন একে অপরের পরিপন্থী নয়
এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি হলো, প্রযুক্তিগত কঠোরতা এবং মানবিক ও সারভাইভার-কেন্দ্রিক যত্নকে প্রতিযোগী অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ফেমিনিস্ট হেল্পলাইনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নিরাপত্তা মানে কেবল ডিভাইস সুরক্ষিত করা নয়। এর সাথে মানসিক সুস্থতা, শারীরিক নিরাপত্তা, সামাজিক পরিস্থিতি, আইনি সহায়তা এবং সর্বোপরি, সারভাইভারের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও জড়িত। তাই এই গবেষণায় প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি সারভাইভারের চাহিদা, স্বায়ত্তশাসন, ইন্টারসেকশনালিটি এবং সম্মিলিত যত্নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। TFGBV মোকাবিলায় ডিজিটাল নিরাপত্তা, শারীরিক সুরক্ষা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং আইনি পরামর্শ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে একসাথে কাজ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে সহিংসতার শিকার হওয়ার পর, কোনো নারীর প্রথম অগ্রাধিকার সবসময় ফৌজদারি মামলা দায়ের করা নাও হতে পারে। তার হয়তো প্রথমে আরও কিছু জরুরি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন হতে পারে: আমি কি নিরাপদ? কে আমার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে? আমার ছবি আর কোথায় কোথায় গেছে? কেউ কি আমার ফোনে নজরদারি করছে? আমার পরিবার জানলে কী হবে? আমি যদি প্রমাণ সংরক্ষণ করি, তবুও কি আমার গোপনীয়তা সুরক্ষিত থাকবে?
একটি বিশ্বাসযোগ্য সাপোর্ট সিস্টেম এসব প্রশ্নকে তদন্তের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রয়োজন “সারভাইভার-নিয়ন্ত্রিত প্রমাণ”
এটি এমন একটি নীতির দিকে পরিচালিত করে যা বাংলাদেশের বিবেচনা করা উচিত: ‘সারভাইভার-নিয়ন্ত্রিত প্রমাণ’।
এর মানে এই নয় যে সারভাইভাররা ফৌজদারি প্রমাণ পরিবর্তন করতে পারবেন। বরং আইনগত এবং প্রযুক্তিগতভাবে যতটুকু সম্ভব, এটি নিশ্চিত করা যে তারা বুঝতে পারেন তাদের ডিভাইস থেকে কী তথ্য নেওয়া হচ্ছে, কেন সংগ্রহ করা হচ্ছে, কার কাছে এর অ্যাক্সেস থাকবে, কোথায় এটি সংরক্ষণ করা হবে, কতদিন রাখা হবে এবং কার সাথে শেয়ার করা হতে পারে।
সহজ কথায়, ডিভাইসটি হস্তান্তর করার মাধ্যমেই অর্থবহ সম্মতির অবসান হওয়া উচিত নয়।
এটি সরাসরি মারিয়া ল্যাবের গবেষণায় দেওয়া বাংলাদেশ-নির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ নয়। বরং এটি ওই গবেষণার সম্মতি-ভিত্তিক ফরেনসিক, স্বায়ত্তশাসন এবং যত্নের ওপর জোর দেওয়ার নীতি থেকে বাংলাদেশের জন্য নেওয়া একটি প্রস্তাবনা। ভালো নীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শেখা উচিত, তবে তা যান্ত্রিকভাবে হুবহু প্রয়োগ করা উচিত নয়।
পাঁচ-স্তরের সাপোর্ট সিস্টেম
মারিয়া ল্যাবের কাজের একটি ব্যবহারিক ফলাফল হলো ‘ফেমিনিস্ট সাপোর্ট চেইন’। একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকায় এই সাপোর্ট প্রক্রিয়াকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে:
১. মামলা গ্রহণ
২. ফরেনসিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন আছে কি না তা মূল্যায়ন
৩. ফরেনসিক তথ্য সংগ্রহ
৪. ফরেনসিক বিশ্লেষণ
৫. ফলো-আপ সহায়তা ও মামলা বন্ধ করার কৌশল প্রদান
বাংলাদেশ নারী সহায়তা কেন্দ্র, সাইবার-সাপোর্ট সার্ভিস, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, আইনি-সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং নারী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে একটি সুরক্ষিত রেফারেল সিস্টেম তৈরি করতে এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করতে পারে।
তবে এমন একটি সিস্টেমের জন্য কিছু সাধারণ ন্যূনতম মানদণ্ড প্রয়োজন: অর্থবহ সম্মতি, ডেটা মিনিমাইজেশন, গোপনীয়তা, সুরক্ষিত সংরক্ষণ, চেইন অব কাস্টডি, স্বাধীন যাচাইকরণ, মনোসামাজিক সহায়তা এবং প্রশিক্ষিত মানব তদারকি। একটি ফরেনসিক ব্যবস্থার মান কেবল কী প্রমাণ বের করা গেল তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়, বরং প্রমাণের পেছনের মানুষটিকে কতটা দায়িত্বশীলতার সাথে পরিচালনা করা হলো, তা দিয়েও বিচার করা উচিত।
প্রযুক্তি নয়, মানুষকে কেন্দ্রে রাখুন
TFGBV-এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পদক্ষেপগুলো স্বাভাবিকভাবেই আইন, অভিযোগ মেকানিজম, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা এবং আইন প্রয়োগের ওপর ফোকাস করে। এগুলো সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু আরেক ধরনের অবকাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ: একটি বিশ্বস্ত সাপোর্ট বা সহায়তা অবকাঠামো।
সারভাইভাররা যদি অপব্যবহারের অভিযোগ জানাতে ভয় পান, প্রমাণ দেওয়ার সময় নতুন করে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন, ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান, অথবা প্রযুক্তিগত ভাষা বুঝতে না পারার কারণে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাতে বাধ্য হন—তাহলে একটি অত্যাধুনিক ফরেনসিক ল্যাবরেটরিও ন্যায়বিচারের অসম্পূর্ণ পথই দেখাবে।
এটি মারিয়া ল্যাবের গবেষণা থেকে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। ডিজিটাল ফরেনসিককে আরও শক্তিশালী হতে হবে, তবে কেবল শক্তিশালী প্রযুক্তির মাধ্যমে নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সম্মতি, উন্নত যত্ন, কঠোর গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং স্পষ্ট জবাবদিহিতা।
বাংলাদেশের এমন একটি ডিজিটাল ফরেনসিক ফ্রেমওয়ার্ক বিবেচনা করা শুরু করা উচিত যেখানে কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি কেবল এটি হবে না যে: “আমরা কি প্রমাণ পেয়েছি?”
এর সাথে আরও চারটি প্রশ্ন করতে হবে:
প্রমাণটি কীভাবে সংগ্রহ করা হলো?
কার সম্মতিতে এটি সম্ভব হলো?
এটি সংগ্রহ করতে গিয়ে কি সারভাইভার আরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন?
এবং প্রক্রিয়া শেষে, তিনি নিজের ডিজিটাল জীবনের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলেন?
ডিজিটাল যুগে ন্যায়বিচার কেবল কোনো অপরাধীকে শনাক্ত করা গেল কি না তা দিয়ে মাপা যায় না। আসল পরীক্ষা হলো, ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে আমরা সারভাইভারের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্বায়ত্তশাসন বিসর্জন না দিয়ে তা রক্ষা করতে পারছি কি না।
লেখক: এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান
অ্যাম্বাসেডর ফর রেসপন্সিবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) অ্যান্ড অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)



