টেকসিঁড়ি টিউটোরিয়ালঃ কম্পিউটার নেটওয়ার্কিংয়ের OSI (Open Systems Interconnection) মডেলের সবচেয়ে নিচের বা প্রথম লেয়ারটি হলো ফিজিক্যাল লেয়ার (Physical Layer)। আমরা যখন ইন্টারনেট বা কোনো লোকাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ডেটা আদান-প্রদান করি, তখন পর্দার আড়ালে থাকা এই ফিজিক্যাল লেয়ারই সব হার্ডওয়্যার ও সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করে।
১। ফিজিক্যাল লেয়ারের উদ্দেশ্য এবং কার্যাবলি (Purpose and Functions of Physical Layer)
ফিজিক্যাল লেয়ারের মূল উদ্দেশ্য হলো উচ্চস্তরের লেয়ারগুলো থেকে আসা ডিজিটাল ডেটাকে (বিট—০ এবং ১) এমন এক ধরণের সিগন্যালে রূপান্তর করা, যা কোনো মাধ্যম (যেমন: তার বা রেডিও ওয়েভ) দিয়ে এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে পাঠানো যায়।
বিট রিপ্রেজেন্টেশন (Bit Representation): এটি ০ এবং ১-এর স্ট্রিমকে ইলেকট্রিক্যাল, অপটিক্যাল বা রেডিও সিগন্যালে রূপান্তর করে।
ডেটা রেট বা থ্রুপুট নিয়ন্ত্রণ:প্রতি সেকেন্ডে কতগুলো বিট পাঠানো হবে (Bit rate) তা এই লেয়ার নির্ধারণ করে।
সিঙ্ক্রোনাইজেশন (Synchronization): প্রেরক (Sender) এবং প্রাপক (Receiver) ডিভাইসের ঘড়ির সময় বা টাইমিং মেলাতে সাহায্য করে, যাতে ডেটা সঠিকভাবে পড়া যায়।
লাইন কনফিগারেশন:ডিভাইসগুলো পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট (সরাসরি দুটি ডিভাইস) নাকি মাল্টিপয়েন্ট (একই লাইনে একাধিক ডিভাইস) সংযোগে থাকবে, তা ঠিক করে।
টপোলজি (Topology):নেটওয়ার্কের ডিভাইসগুলো ভৌতভাবে কীভাবে সাজানো থাকবে (যেমন: স্টার, বাস, রিং বা মেশ টপোলজি) তা ফিজিক্যাল লেয়ারের আওতাভুক্ত।
ট্রান্সমিশন মোড:ডেটা প্রবাহের দিক কেমন হবে—যেমন সিমপ্লেক্স (একমুখী), হাফ-ডুপ্লেক্স (উভমুখী কিন্তু এক সময়ে একজন), নাকি ফুল-ডুপ্লেক্স (একই সময়ে উভয়মুখী) তা নির্ধারণ করে।
২। ফিজিক্যাল লেয়ারের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of the Physical Layer)
ফিজিক্যাল লেয়ার মূলত নেটওয়ার্কের দৃশ্যমান বা ভৌত অংশের সাথে সম্পর্কিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
হার্ডওয়্যার নির্ভরতা: এটি সম্পূর্ণভাবে ক্যাবল, কানেক্টর, নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস কার্ড (NIC) এবং রিপিটারের মতো ভৌত যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল।
স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন:বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন: IEEE, EIA/TIA, ISO) এই লেয়ারের মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল এবং ফাংশনাল স্পেসিফিকেশন তৈরি করে।
সংকেত রূপান্তর (Signal Conversion): এটি কোনো ডেটার ভেতরের অর্থ বোঝে না, শুধু ভোল্টেজ পরিবর্তন বা আলোর পালস (Light pulses) তৈরি ও গ্রহণ করে।
৩। কপার ক্যাবলিংয়ের মৌলিক বৈশিষ্ট্য (Basic Characteristics of Copper Cabling)
নেটওয়ার্কিংয়ে ডেটা পরিবহনের জন্য তামা বা কপার ক্যাবল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কপার ক্যাবলের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:
বৈদ্যুতিক সংকেত (Electrical Signals): কপার ক্যাবল ভোল্টেজের তারতম্যের মাধ্যমে ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল আকারে ডেটা পাঠায়।
অ্যাটেন্যুয়েশন (Attenuation):তামার তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ যাওয়ার সময় দূরত্বের কারণে সিগন্যাল আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ে। একে অ্যাটেন্যুয়েশন বলে। তাই কপার ক্যাবলের একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের সীমা থাকে (যেমন সাধারণত ১০০ মিটার)।
ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফেরেন্স (EMI/RFI): কপার ক্যাবলের চারপাশে থাকা অন্যান্য বৈদ্যুতিক তার বা যন্ত্রপাতি থেকে নির্গত চুম্বকীয় তরঙ্গের কারণে সিগন্যাল নষ্ট বা বিকৃত হতে পারে।
ক্রসটক (Crosstalk): যখন একটি তারের ভেতরের সিগন্যাল পাশের আরেকটি তারের সিগন্যালে বাধা বা গোলযোগ সৃষ্টি করে, তখন তাকে ক্রসটক বলে।
৪। ইথারনেট নেটওয়ার্কের UTP ক্যাবল (UTP Cabling in Ethernet Networks): UTP-এর পূর্ণরূপ হলো Unshielded Twisted Pair। এটি ইথারনেট (Ethernet) লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্কের (LAN) জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যাবল।
UTP ক্যাবলের গঠন:
এই ক্যাবলের ভেতরে চার জোড়া (মোট ৮টি) তামার তার থাকে। প্রতিটি জোড়া একে অপরের সাথে পেঁচানো (Twisted) থাকে। এই পেঁচানোর একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক কারণ আছে—এটি বাইরের ইন্টারফেরেন্স এবং তারগুলোর ভেতরের পারস্পরিক ক্রসটক (Crosstalk) অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। যেহেতু এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো ধাতব আবরণ (Shielding) থাকে না, তাই একে ‘Unshielded’ বলা হয়।

ইথারনেট নেটওয়ার্কে UTP-এর ব্যবহার:
ইথারনেট নেটওয়ার্কে UTP ক্যাবল মূলত বিভিন্ন ডিভাইসকে একে অপরের সাথে যুক্ত করতে ব্যবহৃত হয়:
ডিভাইস কানেক্টিভিটি:কম্পিউটারকে সুইচ, রাউটার বা মডেমের সাথে সংযোগ করতে UTP ক্যাবল ব্যবহার করা হয়। এর মাথায় সাধারণত RJ-45 কানেক্টর লাগানো থাকে।
ক্যাটাগরি নির্ধারণ (Categories): ইথারনেটের স্পিড অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাটাগরির UTP ক্যাবল ব্যবহার করা হয়। যেমন—Cat5e (১ গিগাবিট পর্যন্ত স্পিড), Cat6 এবং Cat6a (১০ গিগাবিট পর্যন্ত স্পিড দিতে সক্ষম)।
ওয়ারিং স্ট্যান্ডার্ড (Wiring Standards): ইথারনেট নেটওয়ার্কে তারগুলো সাজানোর জন্য TIA/EIA-568A এবং TIA/EIA-568B নামক দুটি স্ট্যান্ডার্ড মানা হয়।
স্ট্রেট-থ্রু ক্যাবল (Straight-Through): দুই মাথায় একই স্ট্যান্ডার্ড (যেমন দুদিকেই 568B) ব্যবহার করে কম্পিউটার থেকে সুইচ বা রাউটার সংযোগ করা হয় (ভিন্নধর্মী ডিভাইস)।
ক্রসওভার ক্যাবল (Crossover):এক মাথায় 568A এবং অন্য মাথায় 568B ব্যবহার করে সরাসরি দুটি কম্পিউটার বা দুটি সুইচকে যুক্ত করা হয় (সমধর্মী ডিভাইস)।


